বই পড়ার নেশায় গড়েছেন সাড়ে তিন হাজার বইয়ের লাইব্রেরি দিনমজুর জয়নাল
বছরের যে সময়টায় গ্রামে কাজ থাকে না, সে সময় আরও অনেকের মতো কাজের সন্ধানে গাজীপুরে যেতেন জয়নাল আবেদিন। কীভাবে কীভাবে যেন প্রথমবার এসেই ইটভাটায় কাজ পেয়ে যান তিনি। এরপর গাজীপুর এলে ইটভাটাতেই কাজ নিতেন।
ইটভাটায় রাত দুইটা কি তিনটায় শুরু হয় কাজ। সকাল হতেই শেষ। দুপুরে কোনো কাজ থাকত না। দুপুরে খেয়েদেয়ে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে বিকেলে আশপাশের বাজারে আড্ডা দিতেন জয়নাল। কখনো চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশন দেখতেন।
২০১১ সালের এক দিন। ইটভাটায় কাজ শেষে ঘোরাঘুরি করছিলেন। ফুটপাতে বইয়ের দোকান দেখে থামেন। বইগুলোর নাম জয়নালের ভালো লাগে। দামও কম। দুটি বই কেনেন তিনি। অবসরে বই দুটি পড়েন। ছোটবেলায় স্কুলের বই পড়তে নীরস লাগত আর এই বইগুলো পড়তে আনন্দ লাগছে। তারপর আবার তিনি বই কেনেন। এভাবে দিন দিন বইয়ের নেশা পেয়ে বসে তাঁকে।
এরপর কাজের সন্ধানে যখনই গাজীপুর গেছেন, বই কেনার চেষ্টা করেছেন। গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন, টঙ্গী কলেজ গেট থেকে পুরোনো বই কিনতেন। এভাবে বাড়তে থাকে বইয়ের সংগ্রহ। ভাবতেন, গ্রামে গিয়ে একটা পাঠাগার দেবেন। গ্রামের সবাইকে বই পড়াবেন। আবার নিজেই ভাবতেন, ‘আমি দিনমজুর, পাঠাগার গড়ার কথা শুনে কি বলবে মানুষ।’ নিজেই আবার নিজেকে সাহস দিতেন, ‘যে যা বলে বলুক। পাঠাগার গড়বই।’
সাতভিটা গণপাঠাগার
যথারীতি কাজ শেষে কয়েক মাস পর গ্রামে ফিরে এলেন জয়নাল। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন। জয়নালের প্রস্তাবে সবাই রাজি। গ্রামে একটি পরিত্যক্ত জায়গায় ঘর তোলার সিদ্ধান্ত হলো। যারা সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁদের সবাই জয়নালের মতো খেটে খাওয়া মানুষ। খরচ বাঁচিয়ে সবাই টাকা দেবেন। জয়নাল বলছিলেন, ‘এভাবে টাকা জমিয়ে টিনের চালা তুলি। ছোট একটি বই রাখার র্যাক, কয়টা চেয়ার ও একটি টেবিলও বানাই।’ পাঠাগারের নাম দেন সাতভিটা গণপাঠাগার। ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর পাঠাগারের উদ্বোধন হয়।
পাঠাগারটি বন্ধ হয়ে গেল
২০১৩ সাল। পাঠাগারের বইয়ের সংখ্যা তখন ২০০। শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীরা এসে নিয়মিত বই পড়ে। ভালোই চলছিল সব। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রামে সংঘর্ষ হয়। একজন মারাও যায়। এ ঘটনায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে সাতভিটা। একসময় পাঠাগারটিও বন্ধ হয়ে যায়। জয়নাল বলেন, ‘তখন ভীষণ খারাপ লাগছিল। বাধ্য হয়ে, সাত মাস পর র্যাকসহ বই অন্য একটি পাঠাগারে দিয়ে দিই।’
জয়নাল চলে আসেন গাজীপুরে। তবে তাঁর মন পড়ে থাকত বইয়ের পাতায়। পাঠাগার গড়ার চিন্তায়। কয়েক মাস পর গ্রামে ফেরেন জয়নাল। আবার শুরু করেন বই সংগ্রহ। এবার তাঁর থাকার ঘরের একটি অংশে বই জমান। বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেন। নিজেই আবার সময় করে সংগ্রহ করে আনেন।
জমি হলো পাঠাগারের
২০১৫ সাল। জয়নাল তাঁর এক প্রতিবেশীর কাছে পাঠাগারের জন্য ১ শতাংশ জমি চান। তিনি জমির দাম ধরেন ২০ হাজার টাকা। ঠিক হয়, প্রতি মাসে এক হাজার করে টাকা দিয়ে জমির মূল্য শোধ করবেন জয়নাল। প্রতিবেশী তাতেই রাজি।
জমি কিনে পাঠাগার গড়ার খবর গ্রামে চাউর হয়। জয়নালের কাজকে কেউ বলতে থাকে ‘পাগলামি’, কেউ বলে ‘গরিবের ঘোড়ারোগ!’ জয়নাল বলেন, ‘অনেকে তখন তিরস্কার করত। মন খারাপ হলেও থেমে থাকিনি; বরং একধরনের জেদ কাজ করত।’
২০১৯ সালে জেদের জোরেই এক শতাংশ জমির দাম শোধ করেন। এরপর বন্ধু ও পাঠকেরা মিলে জমিতে মাটি ভরাট করেন। একটি টিনের চালা তোলেন। চেয়ার, টেবিল ও বুকশেলফ বানিয়ে ফেলেন। কেটে যায় দুই বছর। ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয় জয়নালের পাঠাগার—সাতভিটা গ্রন্থনীড়।
হয়েছে পাকা ঘর
জয়নালের গ্রন্থনীড়ের কথা জেনেছিলেন সরকারের যুগ্ম সচিব এনামুল হাবীব। তিনি এখন এলজিএসপি বিভাগের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। একদিন জয়নালের গ্রন্থাগার দেখতে এলেন এনামুল হাবীব। জয়নালের প্রচেষ্টা ও পাঠকসংখ্যা দেখে সেদিনই ঘরটি পাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে আধা পাকা ঘর, আসবাব, কিছু বই, চেয়ার–টেবিল তৈরি করে দেন। ৬ অক্টোবর উদ্বোধন হয় জয়নালের স্বপ্নের গ্রন্থনীড়। এখন প্রতিদিন যেখানে বই পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পাঠক। মাসে বই নিয়ে যান আরও ৫৫০ থেকে ৬০০ পাঠক। গ্রন্থনীড়ের সংগ্রহে আছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বই।
জয়নাল গ্রামেই থাকেন
কাজের সন্ধানে আগে বিভিন্ন জেলায় যেতেন জয়নাল আবেদীন। ২০১৭ সালে গ্রন্থাগার চালুর পর থেকে এলাকাতেই কাজ করেন। শুক্রবার সকাল-বিকেল দুই বেলা; আর অন্য দিনগুলোতে বিকেলে পাঠাগার খোলা হয়। নিজেই সেই দায়িত্ব পালন করেন জয়নাল। জরুরি কাজ থাকলে জয়নালের বন্ধুরা পাশে দাঁড়ান। এলাকার বাইরে যেতে পারেন না বলে আয়–রোজগারও কিছুটা কমে গেছে। তবে জয়নালের স্বপ্ন গ্রন্থাগারটি নিয়েই, ‘এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে সপ্তাহে এক দিন বই নিয়ে যেতে চাই। তখন ছাত্রছাত্রীদের হাতে সহজে বই তুলে দিতে পারব। এ ছাড়া একটা আলোর স্কুল ও বিজ্ঞান ক্লাব করারও চিন্তা আছে।’







Visit Today : 255
Visit Yesterday : 598
This Month : 3211
Hits Today : 698
Total Hits : 3045833

