শিক্ষার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য

শিক্ষা, শিক্ষার প্রয়োজন, গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে অনেক আলোচনা, লেখালেখি এবং কথা বলা দরকার। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সবাই সবকিছু নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়। সব কিছু নিয়ে কথা বলার সমস্যা আমাদের আছে। আমরা সবাই সবকিছু বুঝতে চাই, সবকিছু নিয়ে কথা বলতে চাই। টেলিভিশন, পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে তাকালে আমাদের এই সমস্যা ভালোভাবে চোখে পড়ে। এতে করে শুধু কথাই বলা হয়, কোনো কিছুই আর ঠিকমতো করা হয় না। বিষয়ের সমগ্র রূপটা বোঝা যায় না; দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কর্মযজ্ঞের পটভূমিতে এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির আলোকে কোনো বিষয়ই স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে না।

এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি হয়েছে শিক্ষায়। আমাদের সমাজে এই পরিস্থিতিটা বেশ ভালো বোঝা যায়, যদি আপনি কারো কাছে আপনার অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেন। তিনি আপনাকে একগাদা ডাক্তারি পরামর্শ দেবেন এবং ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আত্মীয়তান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এই হলো ঐতিহাসিক সমস্যা। আপনজন হিসেবে কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তিনি এসব পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু ক্ষতির দিকটা তিনি বিবেচনা করছেন না। বুঝতে চাচ্ছেন না যে, ডাক্তার ছাড়া স্বাস্থ্যগত পরামর্শ দেয়ার যোগ্যতা ও অধিকার অন্য কেউ রাখেন না। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও এ কাজের জন্য রাষ্ট্র তাদেরই প্রস্তুত করেছে এবং অসুখ-বিসুখে তাদের পরামর্শ নেয়াই আমাদের কর্তব্য।

আরো দেখুনঃ মেডিকেল ভর্তি প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় বইসমূহ

আমাদের দেশে শিক্ষার পরিস্থিতিটাও তথৈবচ। বলা যায় আরও নাজুক। ডাক্তারি বিদ্যার মতো শিক্ষাও যে একটি বিজ্ঞান এবং এই বিজ্ঞানে পারদর্শী না হলে কথা বলার, আলোচনা করার, লেখালেখি করার অধিকার তৈরি হয় না, এই বিষয়টি আজও আমরা বুঝতে পারিনি। এমনকী একজন শিক্ষকও যে শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে পারেন না, তা আমরা মানতে নারাজ। কারণ বিষয়টা এমন যে, শিক্ষা নিয়ে কথা তো শিক্ষকরাই বলবেন। অথচ শিক্ষকতা একটি জ্ঞানকাণ্ডের বিষয় আর শিক্ষাবিজ্ঞান অন্য জ্ঞানকাণ্ডের অন্তর্গত। একজন শিক্ষক গণিত পড়াতে পারেন, সাহিত্য পড়াতে পারেন কিংবা অন্য কোনো বিষয়। এর মানে এই নয় যে তিনি শিক্ষাতত্ত্ব নিয়ে কথা বলবেন। কারণ গণিত বা সাহিত্যের মতো শিক্ষাতত্ত্বও আলাদা একটি বিষয়, একটি বিজ্ঞান। এই জ্ঞানে যার পড়াশোনা নেই, পাণ্ডিত্য নেই তিনি শিক্ষা নিয়ে কথা বললে ভুল বলবেন, ভুল তথ্য সরবরাহ করবেন। তবে যে কোনো শিক্ষক শিক্ষাতাত্ত্বিক বা শিক্ষাবিদ হতে পারেন কিংবা জীবনে কোনোদিন শিক্ষকতা না করে বা শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে কোনো সংশ্রব না রেখেও শিক্ষাতাত্ত্বিক বা শিক্ষাবিদ হতে বাধা নেই। কিন্তু শিক্ষকমাত্রই যে শিক্ষাতাত্ত্বিক নন, এই বাস্তবতা এদেশে অধিকাংশ মানুষ বুঝতে চান না। বরং শিক্ষকতা করেন, সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন কিংবা নানাভাবে পরিচিত হয়েছেন তাকেই আমাদের দেশে শিক্ষাবিদ বলে অখ্যায়িত করা হয়। তিনি নিজেও শিক্ষাবিদ সম্বোধন শুনতে পছন্দ করেন। গোড়ায় যদি এত বড় গলদ থাকে, তা হলে শিক্ষার কী অবস্থা? পরিচয়ের এই সঙ্কট শিক্ষাবিভাগ ছাড়া আর কোথাও আছে কি না তা আমার জানা নেই। আর এই সঙ্কটের জন্য আমাদের দেশে শিক্ষাতাত্ত্বিক তৈরি হয়নি, শিক্ষাবিদ তৈরি হয়নি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষকগণ শিক্ষাবিদ হয়ে বসে আছেন। আর তারাই নির্ধারণ করেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কী হবে? এদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাহিত্য-গবেষক, প্রাবন্ধিক, গণিতের শিক্ষক, পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক ইত্যাদি। এই সব শিক্ষকদের ভেতরে দু’একজন শিক্ষাতাত্ত্বিক থাকলেও তাদের তেমন কোনো প্রভাব শিক্ষার ক্ষেত্রে কখনোই পরিলক্ষিত হয় না।

শিক্ষার অনেক সমস্যাই চর্মচক্ষে দেখা যায়। কিছু দেখেন শিক্ষক, কিছু দেখে শিক্ষার্থী এবং কিছু দেখেন অভিভাবক আর কিছু দেখেন সবাই। যা দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায় তা কিন্তু সবাই অনুভব করেন না। কারণ অনুভব করার জন্যও শক্তি থাকা দরকার। আর ওই দেখাটা দেখতে পারেন একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষাতাত্ত্বিক। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকার যে বিপুল গুরুত্বারোপ করেছে তার সাফল্য দেখতে হলে শিক্ষাতাত্ত্বিকদের শরণ নেয়া দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে তেমন কোনো শিক্ষাতাত্ত্বিক তৈরি হয়নি।

শিক্ষা দুই ধরনের মানুষ তৈরি করে। এক ধরনের মানুষ সৃষ্টিশীল আর অন্য ধরনের মানুষ দরকারী। সমাজে কোন ধরনের মানুষ বেশি প্রয়োজন, সৃষ্টিশীল মানুষ নাকি দরকারী মানুষ, সে বিতর্কে যাব না।

আরো দেখুনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতিতে খুঁটিনাটি

একটা সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার লক্ষ্য ছিল জ্ঞান আহরণ। পাঠ্যপুস্তকনির্ভর জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাই ছিল পড়াশোনার লক্ষ্য। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে তো বটেই, সারা পৃথিবীতেই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই লক্ষ্য। শিক্ষকগণই ছিলেন সে সময় সর্বেসর্বা। শিক্ষার্থীদের মেরে কেটে মানুষ করাই ছিল তাদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা কতটা নিষ্ঠুর আচরণ করতেন, তার পরিচয় আছে শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ নামক গ্রন্থে। ডেভিড কপারফিল্ড নামক উপন্যাসেও তার কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। আরও কত গল্প-উপন্যাসে, প্রবন্ধে, গবেষণায়, স্মৃতিচারণায় যে সে সময়ের নির্মম শিক্ষাব্যবস্থার পরিচয় আছে, তার ইয়ত্তা নেই। ওই শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে আছে এবং এমনকী আমাদের দেশেও আছে। আইন করে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি বন্ধ করা হয়েছে। দরকার ছিল বলেই বাইরে থেকে এই বিধান চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এর জন্য শিক্ষকগণ প্রস্তুত ছিলেন না এবং আজও তাদের অনেকেই প্রস্তুত হননি। এজন্য শারীরিক ও মানসিক শাস্তিহীন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কৃতি এখনো তৈরি হয়নি। তারপর দুর্বিনীত, উচ্ছৃখল, অমনোযোগী এবং নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু-সুন্দর বিকাশের জন্য স্কুলে কোনো কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে সুষ্ঠু-সুন্দর পরিবেশে পাঠদানের পরিবেশ অনেক প্রতিষ্ঠানেই বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন পরিবেশে এখনো শিক্ষকগণই সর্বেসর্বা। তাদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো, পথপ্রদর্শকের মতো, দার্শনিকের মতো, শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো, আপনজনের মতো সম্পর্ক তৈরি করে শিক্ষার একটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারেননি। পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষাদান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে বিপুল পরিবর্তন সাধিত হলেও আমাদের দেশে এই পরিবর্তন অতি সামান্য। মূলত শিক্ষাক্রম ও তা বাস্তবায়নে কোনো একটি দেশ কতটা আধুনিকতার পরিচয় দিতে পারল, তার ওপর নির্ভর করে একটি দেশের শিক্ষা দান ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের বুনিয়াদ।

আমাদের শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি কাদের দ্বারা তৈরি হয়েছে, তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান পণ্ডিতদের দ্বারা, বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা তৈরি হয় আমাদের দেশের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক। এদের সঙ্গে স্কুল-কলেজের যে শিক্ষকগণ থাকেন, তারা আদিষ্ট হয়ে কাজ করেন। সুতরাং সেই শিক্ষাক্রমে ও পাঠ্যপুস্তকে যাই থাকুক না কেন তার বাস্তবায়নে আমরা কী দেখতে পাই? গত অর্ধশতকে কোথায় কোথায় আমাদের পরিবর্তনগুলো হয়েছে? বিশেষ করে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাকে আশ্রয় করে যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে যে শিক্ষাক্রম রচনা করেছিলেন, শুধু সে শিক্ষাক্রমের আলোকেই যদি বিষয়টি বিবেচনা করা হয়, তা হলেই বা আমাদের অগ্রগতি কতটুকু? কাউকে বা কিছুকে দোষারোপ করে নয়- খুব বস্তুনিষ্ঠভাবে এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের হাত থেকে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক শিক্ষাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাতাত্ত্বিকদের অধিকারে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল নাগরিক ও নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি শিক্ষাবিজ্ঞানীর কর্মসংস্কৃতি তৈরি করা জরুরি। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও তারা যেন যোগ্যতার পরিচয় রাখতে পারেন, সেই দিকটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তারা যেন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন। দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক জীবনাদর্শ, সংস্কৃতিমনস্কতা, রুচি ও সৌন্দর্যবোধে তাড়িত হয়ে তারা যেন জীবনযাপন করতে পারে তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

Eadmin

Related post