মানবিক মূল্যবোধের জন্য প্রয়োজন শৈল্পিক শিক্ষা
আর্ট সামিটে প্রদর্শনীর পাশাপাশি প্রতিদিন থাকছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, আর্ট পারফরম্যান্স, কর্মশালাসহ রকমারি আয়োজন।
গ্যেটে ইনস্টিটিউটের সহায়তায় এ আলোচনার সূত্রপাত ও সঞ্চালনা করেন ভারতের শিল্পী আকাঙ্ক্ষা রাস্তগী। আলোচকেরা শিশুদের মধ্যে শিল্পশিক্ষা নিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত কাজের অভিজ্ঞতা ও পর্দায় স্লাইড প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁদের কার্যক্রমের পরিচিতি তুলে ধরেন।
ভারতের আসামের ফ্রিল্যান্স শিল্পীদের সংগঠন ‘আঙ্গা আর্ট কালেকটিভ’–এর সদস্যরা বলেন, তাঁরা পাহাড়ি শিশুদের নিয়ে স্কুলের ক্লাসের পর আলাদা করে চারুকলার শিক্ষা দিচ্ছেন। এতে ছবি আঁকার পাশাপাশি তাঁরা পাহাড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ, এ অঞ্চলের সংস্কৃতি–ঐতিহ্য এসবেরও শিক্ষা দিচ্ছেন। পাহাড়ি এলাকার পাথর, বাঁশ, লতাপাতাসহ বিভিন্ন উপকরণ শিল্পের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে শেখাচ্ছেন।
ঢাকার আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠশালার আলোকচিত্রী আশফিকা রহমান জানান, তিনি দেশের উত্তরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। শিশুদের ছবি তোলার কারিগরি দিকগুলো শেখানোর পাশাপাশি প্রকৃতিক সৌন্দর্য দেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলছেন। এই ছবিগুলো নিয়ে তিনি গ্রামেই শর্ষেখেতের পাশে শাড়ি টাঙিয়ে তার ওপর শিশুদের তোলা ছবিগুলো সাঁটিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এতে তাদের মধ্যে অনেক আগ্রহ–উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও এতে আগ্রহী হয়েছেন।
আশফিকা রহমান বলেন, ‘বিদেশি বিশেষত পশ্চিমা আলোকচিত্রীরা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের দেশ ও জনজীবন দেখতে চান। সেভাবেই তাঁরা ছবি তোলেন, তাঁদের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেন। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি, সেই প্রবণতা থেকে বের হয়ে এসে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তথা একটি নিজস্ব চিত্রভাষা তৈরি করতে। সে কারণেই নতুন প্রজন্মের কাছে এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।’
চিত্রশিল্পী মার্জিয়া ফারহানার বক্তব্যও প্রায়ই একই। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে আমাদের দেশের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, সৌন্দর্যচেতনা ও হৃদয়ে সুকুমার বৃত্তির জাগরণ ঘটাতে হবে। এ জন্য তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিল্প–সংস্কৃতির নানা রকমের কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, যদিও এখন শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা নিয়েই অনেকটা সময় দিতে হয়, তবু ক্লাসের পর অন্তত সপ্তাহে এক বা দুই দিন সময় করে তাদের এসব বিষয়ে হাতে–কলমে কাজ করা প্রয়োজন। এ নিয়ে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে কর্মশালা পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজ করছেন।
তুরস্কের শিক্ষক আহমেদ উগুত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। সেখানকার পরিবেশ তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি তিনি মানুষের ঘরবাড়ি বা অফিসে পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার, শিল্পকলা দিয়ে সাজসজ্জার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
দিল্লির শিশুতোষ গ্রন্থের লেখক ও শিল্পী লোকেশ খোড়কে জানান, তিনি কাজ করছেন শিশুদের জন্য কমিকস বই নিয়ে। বইগুলো হিন্দিতে লেখা। এতে একটি নির্দিষ্ট বিষয় ও একটি প্রধান চরিত্র থাকে। সেই চরিত্র নানা মজার ঘটনা দিয়ে তাঁর এলাকায় সেই বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা বা পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে। কমিকসের প্রতি শিশুদের বিশেষ আগ্রহ থাকে। সে কারণে তাঁর এই কার্যক্রম বেশ ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে।
এ ছাড়া আজ জাতীয় চিত্রশালার প্রথম তলায় ছিল ইয়াসমিন জাহানের আর্ট পারফরম্যান্স। তিনি শৈশবের স্মৃতির বিষয়টি তুলে ধরেন। পরের পারফরম্যান্সটি করেন জয়দেব ও ইষাণ রওয়াজা। এটি ছিল কাক নিয়ে একটি কাল্পনিক উপাখ্যানের পরিবেশনা।
এদিন অন্য আয়োজনের মধ্যে ছিল বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, স্মৃতিচারণা ইত্যাদি। আর্ট সামিটে প্রতিদিনই বেলা ১১টা থেকে থাকছে এমন বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন কার্যক্রম।
পলিমাটির বদ্বীপের নান্দনিক উপস্থাপনা
ঢাকা আর্ট সামিটের প্রতিপাদ্য ‘বন্যা’ অবলম্বন করে দেশের প্রধান ও নবীন শিল্পীদের বিভিন্ন মাধ্যমের কাজ নিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের নান্দনিক উপস্থাপনা রয়েছে চিত্রশালার ৬ নম্বর গ্যালারিতে। মূল কাজটির নাম ‘দ্বৈধ’। এতে এ নদীবিধৌত বদ্বীপের সামগ্রিক পরিচয় কয়েকটি আলাদা শিরোনামের দলবদ্ধ কাজে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন শিল্পীরা।
প্রদর্শনীকক্ষে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সামনের দেয়ালজুড়ে কাঠ খোদাই করে তৈরি করা বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবীর অবিস্মরণীয় কার্টুন চরিত্র ‘টোকাই’ দুই হাত মাথার ওপর তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে সতর্কীকরণের ভঙ্গিতে লেখা ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে বদল যাবে পৃথিবী…’। এই ভাবনা থেকেই প্রদর্শনীর এ অংশে দেশের ষড়ঋতুর বৈশিষ্ট্য, কৃষি, নবান্ন উৎসব এসব তুলে ধরা হয়েছে। এ অংশের নাম ‘ব-দ্বীপ’।
কক্ষের মেঝেতে বিছিয়ে রাখা হয়েছে শুকনা খড়, দেয়ালের কিনারা দিয়ে ছড়িয়ে রাখা ধান। দেয়ালে ঋতুবৈচিত্র্যের ছবি আর কৃষিভিত্তিক জনজীবনে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে এ পর্ব সাজানো হয়েছে হাশেম খান, শামসুদ্দোহা, জামাল আহমেদ, শেখ আফজাল, কনকচাঁপা চাকমা, আনিসুজ্জামান আনিস, আবদুল গাফ্ফার প্রমুখ শিল্পীর শিল্পকর্মে।
এরপর ‘জমিন’ নামের অংশে নদ–নদীর অববাহিকার পলিমাটি, কৃষি ও গৃহস্থালির সঙ্গে নারীর সংযোগের দিক উঠে এসেছে নাজলী লায়লা মনসুর, ফরিদা জামান, রোকেয়া সুলতানা, দিলারা বেগম জলিসহ বিভিন্ন শিল্পীর কাজের মিথস্ক্রিয়ায়।
দেশের দক্ষিণ প্রান্তের সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, অদম্য জীবনের প্রতীক বালুমাটি ভেদ করে ওঠা শ্বাসমূল, গোলপাতা, উপকূলবাসীর জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে ‘দেনা’ নামের অংশে। এখানে ছবি, স্থাপনা, ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সুন্দরবনকে নানা কৌণিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান, সৈয়দ আবুল বার্ক্ আলভী, মুস্তাফিজুল হক, নিসার হোসেনসহ অনেকে।
‘জলজ’ নামের অংশে অলক রায়, ঢালী আল মামুন, মেরিনা তাবাসসুমেরা তুলে ধরেছেন পানির প্রভাব ও সংকটের দিকগুলো। ‘বিপ্রতীপ’ অংশে নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনযাত্রা আলোকচিত্রে তুলে এনেছেন আবীর আবদুল্লাহ। পাশাপাশি আহমেদ রাসেল, আশরাফিয়া আদিব, মোহাম্মদ ইমরান হোসেন কাজ করেছেন চিত্রকলা, স্থাপনা পাট, নৌকা এসব নিয়ে।
‘আদি’ নামের অংশটিতে প্রবেশ করলেই নাকে আসবে চামড়ার কটু গন্ধ। মেঝেজুড়ে আঁকাবাঁকা নদীর আদলে কালো চামড়ার অজস্র টুকরা ছড়িয়ে রাখা। এর ওপরে বিশাল এক অদ্ভুত দর্শন জীবের আদল। এভাবেই বুড়িগঙ্গার দূষণকে প্রধান করে দেশের নদ–নদীর দূষণ ও দখল উঠে এসেছে মোহাম্মদ ইউনুস মাহমুদ, মাহমুদা সিদ্দিকা, সোমা সুরভী জান্নাত, ইয়াসমিন জাহান ও নীলুফার চমনের সম্মিলত কাজে।






Visit Today : 146
Visit Yesterday : 2096
This Month : 2242
Hits Today : 1007
Total Hits : 3042069


