ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও আনসারকর্মী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু কিডনি বিভাগে বৈকালিক ডিউটিতে ছিলেন তিনি। পর পর কয়েক দিন এই সময়ে তাঁকে দেখা গেল। নাম নাজমুল। আনসার সদস্য। রোগীর অ্যাটেন্ড্যান্ট ছাড়া কাউকে ওয়ার্ডের ভেতর ঢুকতে দেন না। কোনো টিপসও নেন না। প্রায়ই রোগীর আত্মীয়-স্বজন খেপে যায় তাঁর ওপর। কিন্তু সেদিন দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। এক শিশুর বাবা ওয়ার্ড থেকে গোমড়া মুখে বেরিয়ে বারান্দায় নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন। কিন্তু নিজেকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলেন না। এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলেন নাজমুল। ভদ্রলোককে বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘কাঁদতে দেখলে তো আপনার মেয়েটা আরো অসুস্থ হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

পরের দিনের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে অপরাজেয় বাংলার দিকে যাচ্ছিলাম। সেখানেই সৌম্য চেহারার এই তরুণের সঙ্গে দেখা। কাঁধে একটা ব্যাগ। তড়িঘড়ি করে হাঁটছেন। ঘটনা কী? পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আপনাকে না গতকাল পিজি হাসপাতালে দেখলাম। যাচ্ছেন কোথায়?’ বললেন, ‘ভাই, আমি তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। একটু পরই ক্লাস শুরু হবে।’ মোবাইল নম্বরটা দিয়ে সে যাত্রায় বিদায় নিলেন।

অনটনের সংসার

বাড়ি তাঁর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। বাবা হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক। ভূমিহীন বাজারে ছোট্ট একটা দোকান আছে তাঁর। এককালে রমরমা ছিল। এখন অবস্থা পড়তি জমিদারের মতো। জমিদারির বালাই নেই, কিন্তু তকমাটা রয়ে গেছে। দোকানে বেচাবিক্রি নামমাত্র। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে মিলে ছয়জনের পরিবার। সংসার চালাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। এরই মধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না। গত বছরের শেষ দিকে নাজমুলের মা স্থানীয় একটা এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

ছোট কাঁধে বড় ভার

পরিবারের বড় ছেলে নাজমুল। বয়স মোটে ২০ বছর। এই বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে আনসারের চাকরি নিতে হলো তাঁকে। বললেন, ‘থাকতাম চট্টগ্রামে। দাখিল পরীক্ষার পর দীর্ঘ ছুটি। বাড়ি গিয়ে দেখলাম নুন আনতে পান্তা ফুরায় আমাদের। মা-বাবা খেয়ে না খেয়ে পড়াচ্ছেন আমাদের দুই ভাইকে।’

পরিবারের এই অবস্থায় আলিমে ভর্তি হয়েই টিউশনি কিংবা খণ্ডকালীন চাকরির খোঁজ শুরু করেন নাজমুল। যেন নিজের লেখাপড়ার খরচটা জোগাড় করতে পারেন। তাতে মা-বাবার কষ্ট যদি কিছুটা কমে। এরই মধ্যে সরকারি চাকরির অনেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখলেন। কিন্তু তখনো জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল না তাঁর। ফলে কোথাও আবেদন করতে পারেননি। আলিম দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় এনআইডি হয়ে যায় নাজমুলের।

এদিকে ঋণের কিস্তি দিয়ে আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না নাজমুলের বাবা। চাইছিলেন ছেলেটা যেন সংসারের হাল ধরে। ওই সময় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিল। তাঁদের এক প্রতিবেশী আনসারে চাকরি করতেন। তিনি নাজমুলের মাকে বললেন, ‘ও (নাজমুল) লম্বাটম্বা আছে। চাইলে আনসারে যোগ দিতে পারে। আট ঘণ্টা ডিউটি। পড়াশোনাও করতে পারবে।’

পরে মায়ের কথামতো ‘সাধারণ আনসার’ পদে আবেদন করলেন। সফলভাবে উতরালেন ফিজিক্যাল ফিটনেস, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার বৈতরণি। ট্রেনিং শেষে যোগ দিলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে। প্রথম পোস্টিং চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে। সেখানে ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে আলিম পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কাজে যোগ দেওয়ার মাসখানেক পরই ছিল আলিম ফাইনাল পরীক্ষা। জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে আলিম পাস করলেন।

কোচিং করেননি

বন্ধুবান্ধবরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করছিলেন, নাজমুল তখন সার কারখানায় পাহারা দিচ্ছিলেন। এক দিন ডিউটি শেষে চলে গেলেন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায়। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির গাইড কিনলেন। ডিউটি শেষে ক্যাম্পে সবাই যখন ক্যারম, তাস নিয়ে ব্যস্ত, নাজমুল তখন বসতেন বই নিয়ে। এভাবে পড়েই পরীক্ষা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিট, গুচ্ছ আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে।

এসবের মধ্যেই পত্রিকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করলেন। পুলিশ কনস্টেবল পদেও সব পরীক্ষায় ভালোভাবে টিকে গেলেন। ২০২২ সালের ২১ জুন কনস্টেবল পদে নাজমুলের নিয়োগপত্র আসে। ৩০ তারিখ ট্রেনিংয়ে যোগ দেওয়ার কথা। এ জন্য কিছু কেনাকাটাও করলেন। কিন্তু ২৭ তারিখেই পেলেন জীবনের সবচেয়ে খুশির সংবাদ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে গেছেন তিনি। চান্স পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও গুচ্ছতেও।

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

পুলিশে যোগ না দিয়ে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন নাজমুল। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। এখন প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ঠিকানা শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের গণরুম। কিন্তু গণরুমের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। এরই মধ্যে আনসার বাহিনীর সদর দপ্তরে ঢাকায় বদলির জন্য আবেদন করলেন। নভেম্বরের ২ তারিখ তাঁর পদায়ন হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এখন তিনি হাসপাতালের পাশেই আনসার ক্যাম্পে থাকেন। সেখান থেকেই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। যেদিন ক্লাস থাকে না, সেদিন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করেন। আর দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কোনো দিন যদি বিকেলে ক্লাস থাকে, তখন নাইট ডিউটি করেন।

আমারও সময় আসবে

ক্লাসের পর নাজমুলের সহপাঠীরা হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ওঠেন। অনেকে টিএসসি, কার্জন হলে চুটিয়ে আড্ডা দেন। বিকেলে কনসার্টে গলা মিলিয়ে গান জুড়ে দেন। নাটক দেখেন। কিন্তু নাজমুলকে ছুটতে হয় হাসপাতালের পানে। ক্যাজুয়াল ড্রেস খুলে পরতে হয় ইউনিফর্ম। বিকেল থেকে রাত অবধি চলে ডিউটি। তবু অখুশি নন তিনি। বললেন, ‘অনেকে বলে ফার্স্ট ইয়ার ড্যাম কেয়ার। বন্ধুরাও সবাই যে যার মতো জীবনটা উপভোগ করছে। আমার অবশ্য সে সুযোগ নেই। একা একা নয়, আমি মা-বাবাকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। হয়তো একদিন আমারও সময় আসবে।’

ভাইয়েরও খরচ জোগান

নাজমুলের ছোট ভাই এখন স্থানীয় সৈকত কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। চাকরির বেতনেই পরিবারের ঋণের কিস্তি মেটান। ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচও জোগান। বাকি যা থাকে তা দিয়ে নিজে চলেন নাজমুল। ফুলটাইম চাকরি করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ এখন তাঁর। সঙ্গে পরিবারের ঋণ শোধ নিয়ে রাজ্যের দুশ্চিন্তা তো আছেই। তা-ও চোখেমুখে ভুবনজয়ের স্বপ্ন। বললেন, ‘সমিতির (এনজিও) টাকা পরিশোধের আগ পর্যন্ত ভিন্ন কিছু ভাবতে পারছি না। ভবিষ্যতে দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করতে চাই।’

Eadmin

Related post