পদার্থবিজ্ঞানে বলের স্পিন নির্ভরশীলতা

পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুসারে বলের স্পিন নির্ভর করে ৩ টি বিষয়ের ওপরঃ

১। বোলার যখন বল করেন তখন বলের সুতার (সিম) কোন পাশে তার আঙ্গুল রেখেছেন

২। বলের গতি। এটি আবার নির্ভর করে বোলার কত জোরে বলটি ছুড়েছেন, তার ওপর

৩। বলের ঘূর্ণন গতি অর্থাৎ বল ছাড়ার সময় বোলার কত জোরে বলটিকে ঘোরাচ্ছেন তার ওপর।

স্পিন বোলিং কত প্রকার

সাধারণত স্পিন বল দুই প্রকার হয়ে থাকে। কোন কোন বোলার আঙুলের সাহায্যে বল ঘোরান আবার কোন কোন বোলার কব্জির মোচড়ে বল ঘুরিয়ে থাকেন।

যারা আঙুলের মাধ্যমে স্পিন বল করেন, তাদের অফ স্পিনার বলা হয়। আর যারা কব্জির মোচড়ে বল ঘোরা্‌ তারা লেগ স্পিনার।

অফ স্পিনার বোলারা সাধারণত ডানহাতি হন। একজন ডানহাতি অফ স্পিনার আঙুলের সাহায্যে বলকে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরিয়ে থাকেন। পিচে আঘাত করার পর অফ স্পিন বল একজন ডানহাতি ব্যাটারের অফ সাইড থেকে লেগ সাইডের দিকে সরে যায়।

অন্যদিকে, একজন ডানহাতি লেগ স্পিনার কব্জির মোচড়ে বলকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরান। পিচে আঘাত করার পর লেগ স্পিন বল একজন ডানহাতি ব্যাটারের লেগ সাইড থেকে অফ সাইডের দিকে চলে যায়।

অফস্পিন ও লেগস্পিনের এই কৌশলগুলো সাধারণ পর্যায়ের। আন্তর্জাতিক মানের বোলাররা বল ছোঁড়ার সময় এসকল কৌশলের বাইরে আরও বেশি কিছু করেন। এতে করে বল বাতাসে ভেসে থাকার সময় এবং মাটিতে আঘাত করার পর বলের মুভমেন্টের ধরণ বদলে যায়।

বল ছোঁড়ার পর থেকে মাটিতে পিচ করা পর্যন্ত বলের গতিবিধি নির্ভর করে বোলারের হাতের জাদুর ওপর। তবে মাটি থেকে লাফিয়ে ওঠার পর বলটির গতিবিধি অনেকটা পিচের অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

সেই সাথে বোলাররা এমন কৌশল অবলম্বন করেন যাতে ব্যাটার বোলারের গ্রিপ না দেখতে পান, বা ভুল দেখতে পান। বোলারদের বলের গ্রিপ আড়াল করে রাখতে হয়। কারণ, বল ছোঁড়ার সময় বোলারের গ্রিপ দেখতে পেলে কি ধরণের বল হতে পারে সে বিষয়ে ব্যাটার সম্ভাব্য একটি ধারণা পেয়ে যান।

স্পিন বোলিংয়ে  বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো কাজ করে

স্পিন বোলিংয়ে ৩টি ফোর্স বা বল কাজ করে। এগুলো হলো-  ১। অভিকর্ষ বল (এটি পৃথিবীর আকর্ষণ বল। খাড়া নিচের দিকে কাজ করে) ২। ড্র্যাগ ফোর্স (বলের গতির ফলে সৃষ্ট হয় এবং এটি বলের বিপরীত দিকে কাজ করে) ৩। বলটি স্পিন করার ফলে সৃষ্ট ঊর্ধ্বমুখী বল যাকে লিফট বা ম্যাগ্নাস নামে ডাকা হয়। বল পিচ  করার পর লাফিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই বলটি ভূমিকা রাখে।

স্পিনাররা বলের তিন ধরণের স্পিনকে কাজে লাগান। এগুলো হলো- টপ স্পিন, আন্ডার স্পিন ও সাইড স্পিন।

বলের টপ স্পিন, আন্ডার স্পিন ও সাইড স্পিনের ক্ষেত্রে বলের গতির দিকে সাথে স্পিন ভেক্টরটি লম্বালম্বিভাবে থাকে। এধরণের স্পিনগুলোর গাণিতিক বিশ্লেষণ খুব একটা জটিল না। তবে যেসব ক্ষেত্রে স্পিন ভেক্টরটি বলের গতির দিকে সাথে লম্বালম্বিভাবে থাকেনা, তখন এদের বিশ্লেষণ করা বেশ জটিল।

এছাড়া মাঠে বাতাস থাকলে স্পিন বলের গতির বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসকল পরিস্থিতিতে বল সঠিকভাবে রিডিং করা ব্যাটারের জন্য দুরহ হয়ে পড়ে।

তবে এই ধরণের কঠিন পরিস্থিতিই মনে আশা করেন স্পিনাররা এবং সেই পরিস্থিতকে কাজে রানের গতি টেনে ধরা বা আরও দুই একটি উইকেট নেওয়া স্পিনারদের লক্ষ্য। তাদের চেষ্টা থাকে বলের স্পিনের অক্ষ এবং বলের গতির দিক যতটা সম্ভব একই দিকে রাখা।

স্পিন বোলিংয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা – ড্রিফট ও ডিপ

স্পিন বলের গতি প্রকৃতি বারনৌলির নীতি দিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করা যায়। বারনৌলির নীতি ব্যবহারের পূর্বে বাতাসকে এক প্রকার তরল হিসেবে মেনে নিতে হবে। বারনৌলির নীতিতে বলা হয়েছে যে কোন তরলের ভেতর স্থিতিশক্তি, গতিশক্তি ও চাপের পরিমাণ ধ্রুবক। তাই গতিশক্তি বাড়লে স্থিতিশক্তি অথবা চাপের পরিমাণ হ্রাস পাবে।

স্পিনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা- ডানহাতি ব্যাটারের বিরুদ্ধে লেগস্পিন বল

সব স্পিনের বলের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মোটামোটি একই রকম। উদাহরণ হিসেবে আসুন দেখি একজন ডানহাতি ব্যাটারের বিরুদ্ধে ডানহাতি লেগ স্পিন বলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

একজন ডানহাতি লেগ স্পিনার যখন একজন ডানহাতি ব্যাটারের বিপক্ষে বল করেন তখন বলটি ব্যাটারের লেগ সাইড থেকে অফ সাইডের দিকে ঘুরতে থাকবে। এই স্পিন বা ঘূর্ণন হবে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে। স্পিনটি উল্লম্ব বা খাড়া দিকের সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণ তৈরি করবে।

এখন আমরা ব্যাটারের দৃষ্টিতে এই বলের গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করবো।

বাতাসের ভেতর দিয়ে যখন বলটি এগিয়ে যায় তখন বলের ঘূর্ণনের কারণে বলের বামপাশে বাতাসের গতি ডানপাশের গতির তুলনায় কম হয়। দুইপাশে বাতাসের গতি দুইরকম হবার কারণে বারনৌলির নীতির কারণে বলের উভয় পাশে বাতাসের চাপের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়।

তবে, বলের উচ্চতা স্থির থাকায় স্থিতিশক্তিও ধ্রুবক থাকবে।

এই পরিস্থিতিতে বারনৌলির নীতির কারণে বলের উভয় পাশের চাপের মধ্যে বামপাশে বাতাসের চাপের পরিমাণ বেশি থাকবে, ডানপাশের তুলনায়। ফলে বল মাটিতে পড়ার আগে বাতাসের আগে ডানপাশে কিছুটা সরে যাবে বা ড্রিফট করবে।

তবে দক্ষ বোলার প্রয়োজনে ড্রিফটের সাথে বল ডিপ করাতেও সক্ষম। সেটি কিভাবে সম্ভব?

বলে সর্বোচ্চ ডিপ করতে বোলারকে টপ স্পিন করতে হয় আর সাইড স্পিন করালে ভাল ড্রিফট পাওয়া যায়। তো এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি অবস্থান অর্থাৎ খাড়া দিকের সাথে বলের সিম ৪৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি করলে বলটি একই সাথে ড্রিফট ও ডিপ করবে।

তবে এই ধরণের বল বোলার নিশ্চয়ই সবসময় করেন না। শত্রু ঘায়েলের বিশেষ অস্ত্র এই ধরণের বল।

১৯৯৩ সালের জুনে অ্যাশেজ সিরিজের ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বোলার শেন ওয়ার্ন ইংল্যান্ডের মাইক গেটিংকে এই ধরণের একটি বলে বোল্ড আউট করেন। সেই বিখ্যাত বলটি ‘বল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

লেগ স্পিনের বদলে অফ স্পিন বা চায়নাম্যান বোলিংয়ের ক্ষেত্রেও বোলার বারনৌলির নীতি অনুসারে বলে প্রয়োজনীয় ড্রিফট আর ডিপ সৃষ্টি করেন। বলের স্পিনে সামান্য তারতম্যও ব্যাটারের জন্য বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে।

একজন বোলার বলে কি পরিমাণ স্পিন তৈরি করতে সক্ষম তার ওপর বলের ড্রিফট ও ডিপ নির্ভর করে। ভাল স্পিন বোলার ব্যাটারকে পিচে স্থির হতে দিতে চান না। সেজন্য বলের স্পিন ও বলের গতিপথ সবসময় এক রকম রাখেন না। সেখানে অনেক বৈচিত্র্য থাকে।

Eadmin

Related post