কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেন নাই বৃষ্টি
মৌলভীবাজারের চা বাগান শ্রমিকের মেয়ে বৃষ্টি অধিকারী। বড় হতে হতেই বুঝেছিলেন, কেবল পড়াশোনা না মেয়ে সন্তানের জন্য একটা পরিবারের অনেক টাকা খরচ হয়। আর সেই বোধ থেকেই বৃষ্টি চাইতো এমন কিছু করতে যেন পড়াশোনা, জীবনযাপন কোনো কিছুর জন্য পরিবার থেকে তাকে কোনো টাকা নিতে না হয়। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত চা বাগানের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়াশোনা করেছেন বৃষ্টি। এরপর সে ক্যামেলিয়া ডানকান স্কুলে (কেডিএস) ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার জন্য শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে যান। বৃষ্টি পড়াশোনার জন্য চলে গেলেন কেডিএসের হোস্টেলে। পড়াশোনা থেকে একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন, সকল দায়িত্ব ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষের। বৃষ্টির সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় ছিল তাঁর পড়াশোনার খরচ আর পরিবার থেকে নিতে হবে না।। সেই পাঁচ বছরের পরিবেশটা তাঁকে একদম বদলে দিয়েছে। শিক্ষকেরা বাবা মায়ের মতো স্নেহ করতেন। শিক্ষকদের উৎসাহের কারনেই তাঁর পড়াশোনার পাশাপাশি নাচ, গান, ছবি আঁকা, গার্লস গাইডিংয়ের কাজ এমনকি ইংরেজিতে দক্ষতাও তৈরি হয়। স্কুলে মাঝে মাঝেই বিদেশ থেকে দাতা প্রতিষ্ঠানের লোকেরা আসতেন, তাঁদের সাথে শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে কথা বলতে হতো। বৃষ্টি বলেন, ‘আজ আমি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডাব্লিউ) পড়তে পারছি, বলা যায় কেডিএসের পড়াশোনার পদ্ধতিই আমাকে সেই সাহস দিয়েছে, আমাকে তৈরি করেছে।’ এসএসসির পর শমশেরনগর সুজা মেমোরিয়াল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন বৃষ্টি। শুরু হলো বৃষ্টির যুদ্ধের দিন।

বড় এক ভাই, ছোট দুই ভাই পড়াশোনা করছেন। তাদের পড়াশোনার খরচ আছে। নিজের পড়াশোনার খরচ কিভাবে জোগাড় হবে সেই চিন্তা তো আছেই। তার ওপর ছোট দুই ভাইয়ের দেখাশোনার কাজটাও করতে হতো। কেডিএসের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে যদিও সে প্রতিমাসে ১৫০০ টাকা পেত। কিন্তু এই টাকায় কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়া, যাতায়াতের খরচ, বুঝে উঠতে পারছিলনা বৃষ্টি, কি হবে সামনের দিনে। তবে একটা জিনিস তিনি জানতেন, যারা কেডিএস থেকে পড়াশোনা করে, যেহেতু তাঁরা অংকে এবং ইংরেজিতে ভালো, স্থানীয় অভিভাবকদের কাছে টিউশনির জন্য তাদের একটা ভালো চাহিদা আছে। ছোট দুইভাই, কলেজের ক্লাস সব সামলে টিউশনি শুরু করলেন বৃষ্টি। সকাল ৭ টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে কলেজের সকালের ক্লাস করতেন। ফেরার পথে টিউশনি করিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ৭ টা। বাড়ি ফিরে দুই ভাইয়ের দেখভাল করা। এভাইবেই শেষ হলো বৃষ্টির এইচএসসি।

ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ের জন্য যে টাকার দরকার ছিল, টিউশনি থেকে তা জোগাড় করা সম্ভব ছিলোনা। তাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেন নি বৃষ্টি। একদিন হঠাৎ এক বান্ধবী ফোন করে জানান যে পরেরদিন এইউডাব্লিউ তে ভর্তি পরীক্ষা হবে, বৃষ্টি যেন তাতে অংশ নেয়। একরাতের মধ্যে বৃষ্টি সিদ্ধান্তই নিয়ে উঠতে পারেনি, যে কি করবেন। কিন্তু যেই মেয়ে নিজে কলেজে পড়ে, কলেজের শিক্ষার্থীদের টিউশনি করিয়েছেন। স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত যে কোনদিন ক্লাসে তৃতীয় হননি। নিজের উপর তার এতোটুকু ভরসা ছিল যে, পরেরবারের পরীক্ষায় অংশ নিলে সে ঠিক ভর্তির সুযোগ পাবে। হলোও তাই, দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় এইউডাব্লিউতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান। এইউডাব্লিউতে বৃষ্টি চার বছরের পড়াশোনার পুরো খরচ পাবে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি থেকে। এবার যেন খুশির শেষ নেই। পড়াশোনাটা ছাড়তে হবেনা। নিজের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হবে, এইটাই যেন জীবনের বড় প্রাপ্তি বৃষ্টির। পড়াশোনা শেষ করে বৃষ্টি নিজের এলাকায় একটি হাসপাতাল করতে চান, যেখানে দরিদ্র মানুষেরা বিনামূল্যে চিকিৎসা করাতে পারবেন।





Visit Today : 591
Visit Yesterday : 262
This Month : 2949
Hits Today : 2160
Total Hits : 3045052

