নৈশ প্রহরী উহ্লাচিং এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হন তাঁর বাবা। একসময় পড়ে যান বিছানায়। তখন থেকে ছোট বোনের পড়াশোনা, সংসারের খরচ—বলতে গেলে একাই সামলাতে হচ্ছে উহ্লাচিং মারমাকে। রাত জেগে পাহারা দিতেন খাগড়াছড়ি জেলা জজকোর্ট। দিনে পড়তেন। এভাবেই সুযোগ পেয়েছেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আরো অনেক দূর যেতে চান উহ্লাচিং মারমা।
আজ ডিউটি নেই?‘আছে, রেডি হচ্ছি।

উহ্লাচিং বলছিলেন, ‘কী করব কিছুই মাথায় আসছিল না। বাবা বিছানায়। ঘরে মা আর বোন। তিনটা মুখের আহার কোথা থেকে আসবে বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’ পরে এক প্রতিবেশীর পরামর্শে গেলেন জজকোর্টে। তাঁর বাবার কর্মস্থলে। কাকুতি-মিনতিতে মন গলে কর্তৃপক্ষের। বাবার চাকরিটা ছেলেকে দিতে রাজি হয়। তবে অস্থায়ী। বললেন, ‘বাবার অফিস কর্তৃপক্ষ আমাকে চাকরিটা যখন দিল মনে হলো, দারোয়ানের চাকরি নয়, যেন সোনার হরিণ হাতে পেয়েছি।’
বিকেল ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডিউটি। বগলে লাঠি আর হাতে টর্চ নিয়ে রাত জেগে পাহারা দিতেন। বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ার ছিল। ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে সেখানে বসে বিশ্রাম নিতেন। সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকালে এসে ঘুমিয়ে যেতেন। ক্লান্ত শরীরে পড়ায় মন বসত না। নিয়মিত ক্লাসও করতে পারতেন না। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত—ঋতু বদল হলে উহ্লাচিংয়ের এই রুটিনে কোনো বদল হতো না। ‘শুরুর দিকে বাবা খাগড়াছড়ি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মা রাতে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। রাতভর ডিউটি করে সকালে দিদিমার বাড়িতে গিয়ে খেতাম। মা-বাবার জন্য খাবার নিয়ে আবার যেতাম হাসপাতালে’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন উহ্লাচিং। মাস শেষে ১৪ হাজার টাকা পেতেন। তিন হাজার টাকা রেখে বাকিটা মায়ের হাতে তুলে দিতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু এখনো অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি। পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি সংসার কিভাবে চলবে—এই দুশ্চিন্তা ভর করছে মনে।
এভাবে চলবে না
কলেজে নিয়মিত যেতেন না। পড়াশোনা লাটে ওঠার দশা। প্রতিবেশীরাও উহ্লাচিংয়ের মাকে বলেছিল, ছেলেকে আর পড়ানো ঠিক হবে না। আজকাল পড়াশোনা করে লাভ নেই। উহ্লাচিং ভাবলেন, এভাবে চলতে থাকলে এইচএসসিতে নির্ঘাত ফেল করে বসবেন। প্রতিবেশীদের কটুবাক্য শুনে জেদ চেপে গেল। মনে মনে বললেন, ‘যত সমস্যাই আসুক না কেন, আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে।’
তখন থেকে জজকোর্টে যাওয়ার সময় বই নিয়ে যেতেন। রাতে ডিউটির ফাঁকে সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসতেন। কোন কোন অধ্যায়ে নিজের দুর্বলতা আছে, সেগুলো চিহ্নিত করতেন। এইচএসসির দুই মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রীতিময় ত্রিপুরার কাছে পড়া বুঝে নিতেন। বললেন, ‘অল্প সময়ে কিভাবে পড়া শেষ করতে হয় সেটা শিখিয়েছেন প্রীতিময় দাদা। স্বপ্ন দেখিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের।’ জিপিএ ৪.৫০ নিয়ে এইচএসসি পাস করলেন।
কোর্টের বারান্দায় বসে কাঁদতেন
এইচএসসির পর মা-বাবাকে গিয়ে বললাম, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই।’ শুনে তাঁদের মুখ কালো হয়ে গেল! কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে তো চাকরি ছাড়তে হবে। তাহলে সংসার চলবে কী করে—এই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসল। তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে সেবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফরম পর্যন্ত পূরণ করেননি।
উহ্লাচিংয়ের খুব খারাপ সময় গেছে তখন। সহপাঠীরা স্বপ্ন দেখছেন বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আর উহ্লাচিং রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। বললেন, ‘চোখের সামনে নিজের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে দেখে খুব খারাপ লেগেছে। গভীর রাতে কোর্ট সুনসান থাকত। তখন বারান্দায় বসে চোখের জল ফেলতাম।’ তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ডিউটির পর মা-বাবার অগোচরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তম নামে এক ছাত্রের কাছে পড়তে যেতেন। কিছুদিন পর তা জানাজানি হয়ে গেল। মা বললেন, ‘আমি জানি, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাও, কিন্তু কী করব। এখনো ধারদেনা পরিশোধ করা যায়নি। তোমার বাবার অবস্থাও ভালো না।’ অগত্যা রণেভঙ্গ দিলেন উহ্লাচিং।
আবার এলো সুযোগ
এবার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মাস দুয়েক আগে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল উহ্লাচিংয়ের। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পারবি না। তবে চাইলে গুচ্ছ (সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা) পরীক্ষার ফরম তুলে রাখতে পারিস।’ বন্ধুর কথা শুনে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে লাগলেন। বাড়ি গিয়ে একদিন বললেন, ‘বাবা, এবার আমি শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে দেখব।’ শুনে তিনি উহ্লাচিংয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। পরে বললেন, ‘ঠিক আছে।’
বাবার অনুমতি পেয়ে নতুন উদ্যমে আবার পুরনো বইগুলো পড়া শুরু করলেন। সময় মাত্র দুই মাস। কোনটা রেখে কোনটা পড়বেন কূল পাচ্ছিলেন না। চাকরির ধকল সহ্য করে এই দুই মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন উহ্লাচিং। ফলও পেলেন হাতেনাতে। গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট এবং গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেন।
এখনো মেঘ কাটেনি
প্রকৌশলী ক্যসাচিং মারমাসহ কয়েকজনের সহায়তায় এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু এখনো অনিশ্চয়তার মেঘ কাটেনি। নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি সংসার কিভাবে চলবে—এই দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে এই তরুণকে। উহ্লাচিং বললেন, ভর্তি হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।






Visit Today : 34
Visit Yesterday : 598
This Month : 2990
Hits Today : 197
Total Hits : 3045332

