পরীক্ষাবিমুখ কিশোর থেকে বিদ্যাসাগর
যে মুলোটা বড়, তা পত্তনেই বোঝা যায়। বিদ্যাসাগর যে বড় হবেন, সেটা সবাই বোঝেননি, একজন ছাড়া। তিনি প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ, কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক। তিনি কী বুঝেছিলেন কে জানে, বিদ্যাসাগরের দিকে বাড়তি মনোযোগ রাখতেন সব সময়। একবার কিছুতেই পরীক্ষা দেবেন না বিদ্যাসাগর। তখনকার স্কুলগুলোও তো আজকের মতো চাকচিক্যময় ছিল না। বিদ্যাসাগর গোঁ ধরে বসে রইলেন স্কুলের মাঠে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ব্রিটিশ সাহেব, মার্শাল। প্রেমচন্দ্র গিয়ে ধরলেন তাঁকে। বললেন, কিছুতেই তিনি বিদ্যাসাগরকে পরীক্ষার হলে আনতে পারছেন না। তখন সাহেব আর শিক্ষক মিলে গিয়ে চেপে ধরলেন বিদ্যাসাগরকে। বিদ্যাসাগর হাত ছোড়াছুড়ি করেছিলেন, পরীক্ষা দেবেন না বলে গলাও ফাটিয়েছিলেন, কিন্তু দুই শিক্ষক তাঁকে চ্যাংদোলা করে ধরে, হাত-পা ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেন পরীক্ষার বেঞ্চে। তখন আর বাছাধন পরীক্ষা না দিয়ে যাবেন কোথায়! পরে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। তখনো প্রেমচন্দ্র সেই কলেজের সাধারণ অধ্যাপক। কিন্তু বিদ্যাসাগর যে সেই কলেজের প্রিন্সিপাল, সেটাই মাঝেমধ্যে ভুলে যেতেন প্রেমচন্দ্র। মাস্টারি ফলাতেন বিদ্যাসাগরের ওপর। বিদ্যাসাগর তাতে অসন্তুষ্ট হননি কখনো।
প্রেমচন্দ্র বুঝেছিলেন বিদ্যাসাগরের প্রতিভা। তাই বিশেষ যত্ন নিয়েছিলেন তাঁর খেয়ালি ছাত্রটির প্রতি। সেই বিদ্যাসাগরের হাতেই জন্ম নেয় বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি। সমাজ উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে তখন নারী-পুরুষের মধ্যে চরম বৈষম্য। নারীদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার নেই, বিয়ে দিতে কাঁড়ি কাঁড়ি যৌতুক লাগে। বিধবা মেয়েদের দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ। বিধবাবিবাহের পক্ষে আন্দোলনে নামেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কোনো সামাজিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজে উদাহরণ তৈরি করতে হয়। বিদ্যাসাগর নিজের অবিবাহিত ছেলেকে এক বিধবা নারীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বিধবাবিবাহ আন্দোলন জোরদার করেন।
আমরা যে আধুনিক বাংলা লিপি ব্যবহার করি, এর সংস্করণ করেন বিদ্যাসাগর। এর আগে বাংলা ভাষায় দাঁড়ি (।) ছাড়া আর কোনো যতিচিহ্ন ছিল না। তিনিই প্রথম কমা (,), সেমিকোলন (;), ড্যাশ (—), হাইফেন (-) এসব যতিচিহ্ন চালু করেন। লেখেন বর্ণপরিচয় নামে শিশুদের বর্ণশিক্ষার কালজয়ী বই। দেড় শ বছর পেরিয়ে এসে সেই বইটা আজও এ দেশের শিশুদের অ আ ক খ শেখার প্রধান মাধ্যম।
বিদ্যাসাগরকে লোকে ‘দয়ার সাগর’ নাম দিয়েছিল। গরিব-দুঃখী মানুষের দুঃখ ঘোচাতে সব সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন বিদ্যাসাগর। নিজের গ্রামেই ৫০০ গরিব মানুষের থাকা-খাওয়া আর পোশাক-আশাকের বন্দোবস্ত করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এ দেশের শিক্ষাবিস্তারেও বিদ্যাসাগর পুরোধা পুরুষ। নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা তিনিই করেন। এক শটির মতো স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের উদ্যোগে, এর প্রায় অর্ধেকই ছিল বালিকা বিদ্যালয়। সরকারি চাকুরে ছিলেন, নিজেরও অর্থবিত্ত ছিল, তাই স্কুল প্রতিষ্ঠা আর তার ব্যয়ভার বহন করতে কোনোই বেগ পেতে হয়নি বিদ্যাসাগরকে। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে একসময় সম্পর্ক ছিন্ন হয় বিদ্যাসাগরের, কিন্তু স্কুল প্রতিষ্ঠা থেমে যায়নি তাঁর। সরকারের সহযোগিতা না পেলে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে স্কুল নির্মাণ করতেন এবং সেগুলো পরিচালনার ব্যয়ভার বহন করতেন।
বিদ্যাসাগরের কাজ তাঁকে মহামানবে পরিণত করেছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ছেলেবেলা নিয়ে নানা কাহিনি চালু হয়। তিনি নাকি খুব দরিদ্র ঘরের সন্তান ছিলেন, খুব দুঃখ-কষ্টে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা—এ কথাটা কিন্তু সত্যি নয়। অত ধনী ঘরে তাঁর জন্ম নয় ঠিকই, তাই বলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটেনি। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার সাধারণ একজন চাকুরে। তাই গ্রামের স্কুলেই সাদামাটাভাবে শুরু হয় বিদ্যাসাগরের শিক্ষাজীবন। তাঁর সম্পর্কে আরেকটা গল্প চালু আছে। তিনি নাকি এতই মেধাবী ছিলেন, যেকোনো বইয়ের পাতা একবার ওল্টালেই সব নাকি মুখস্থ হয়ে যেত। তাই এক বই একবার নেড়েচেড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিতেন। এ জন্য তাঁকে বকাঝকা করতেন শিক্ষক কিংবা অভিভাবকেরা। তিনি তখন নাকি গড়গড় করে বলে দিতেন সেই বইয়ের কোন পাতায় কী আছে! বুঝতেই পারছ, এটাও গালগপ্পো-মুখস্থবিদ্যার সঙ্গে মেধার কোনো সম্পর্ক নেই, সে কথা নিশ্চয়ই তোমাদের অজানা নয়। বিদ্যাসাগর কিন্তু মেধাবীই ছিলেন, মুখস্থবিদ নন।
বাংলার শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।






Visit Today : 182
Visit Yesterday : 2096
This Month : 2278
Hits Today : 1379
Total Hits : 3042441


