গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শৃঙ্খলার অপেক্ষা
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আগামীকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। ঢাকার সেগুণবাগিচায় আন্তজার্তিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ওই পরীক্ষার স্কোরের ভিত্তিতে ভর্তির ব্যবস্থা চালু করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। স্যাটের মতো ব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করে ৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী তাঁর এ ইচ্ছার কথা বলেন। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণের জন্য কতখানি তৈরি, তা মূলত স্যাট পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়।
অবশ্য বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতায় এটি কতখানি সম্ভব, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
বর্তমানে সারা দেশে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১১৪টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৮৮০টি কলেজে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মাদ্রাসা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাতটি বড় সরকারি কলেজে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রি পাস কোর্স। দেশে ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১১৪টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৮৮০টি কলেজে স্নাতক পড়ানো হয়।
২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এরপর এখন উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৮৭ জন পাস করেছেন। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যানুযায়ী দেশে উচ্চশিক্ষায় মোট আসন ১৩ লাখের মতো। সে হিসাবে সার্বিকভাবে ভর্তিতে আসন নিয়ে সংকট হবে না। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ নির্ধারিত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন কম থাকায় সেগুলোতে ঠিকই তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। এমনকি যত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, তাঁদের সবাই প্রত্যাশিত জায়গায় ভর্তির সুযোগ পাবেন না। উল্লেখ্য, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (জাতীয়, উন্মুক্ত, ইসলামি আরবি বাদে) আসন আছে ৬০ হাজারের মতো।
গুচ্ছে এখনো সমস্যা
একসময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলাদাভাবে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ভর্তি পরীক্ষা নিত। ফলে শিক্ষার্থীদের সীমাহীন দুর্ভোগের সঙ্গে ছিল আর্থিক ক্ষতিও। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে আলোচনা, চেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নির্দেশনার পর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে প্রথমে গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু করে কৃষি ও কৃষিশিক্ষাপ্রধান সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা পরীক্ষা দিতে হয় না। একটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী তাঁর যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী গুচ্ছে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও (রুয়েট) আলাদা একটি গুচ্ছভুক্ত হয়ে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। এই দুই গুচ্ছের পরীক্ষা নিয়ে বড় কোনো সমস্যার কথা শোনা যায়নি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যে গুচ্ছ, সেই ২২টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে সংকটগুলো রয়ে গেছে। এ ব্যবস্থায় আগের চেয়ে ভোগান্তি কমলেও এখনো শিক্ষার্থীদের কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। মূলত ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দীর্ঘদিন সময় নিয়ে আসন পূরণ করতে হয়।
অবস্থাটি এমন জায়গায় গেছে, দুইবার এ ব্যবস্থায় ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পর এই গুচ্ছে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ‘অসুবিধার’ কথা বলে এ ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে নিজস্ব ব্যবস্থায় আগের মতো ভর্তি পরীক্ষায় যেতে চাচ্ছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সময় বেশি লাগে। আরও কিছু সমস্যা হয়। এ জন্য তাঁরা চান নিজস্ব স্বকীয়তা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভর্তি করতে।
জানা গেছে, আরও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একই পথে হাঁটতে চায়। অবশ্য, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মানে এখন পর্যন্ত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ই গুচ্ছে থেকে ভর্তির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আছে।
অবশ্য ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত ওই গুচ্ছে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অব্যবস্থাপনা, আন্তরিকতার ঘাটতির কারণেই সংকটগুলো দূর হয় না। অভিযোগ আছে, এককভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিলে ভর্তির ফরম ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বিপুল টাকা শিক্ষকেরা ভাগ–বাঁটোয়ারা করে নিতে পারেন। কিন্তু গুচ্ছে থাকায় সেই সুযোগ কমে গেছে। সে জন্য গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষাকে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকদের অনেকেই সফল হতে দিতে চান না।
যদিও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকনেতা আইনুল ইসলামের ভাষ্য, প্রয়োজনে তাঁরা টাকা ছাড়াই ভর্তি পরীক্ষা নেবেন।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় ওই ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যের বিষয়গুলোর জন্য তিন দিনে আলাদা তিনটি ভর্তি পরীক্ষা হয়। এ ব্যবস্থায় ফলাফলের ভিত্তিতে দুই ধাপে ভর্তির কাজটি হয়। একটি প্রাথমিক ভর্তি, আরেকটি ধাপ হলো চূড়ান্ত ভর্তি। প্রাথমিক ভর্তির জন্য একেকজন শিক্ষার্থীকে আংশিক ভর্তি ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। এ ব্যবস্থায় বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের (মাইগ্রেশন) সুযোগ আছে। মাইগ্রেশনসহ প্রাথমিক ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত ভর্তির কাজ নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় করছে। তবে বাস্তবে কাজটি এত সহজে হয় না। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়াতে হয়। আবার ভর্তির কাজে সময়ও অনেক বেশি লাগছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থী জানালেন, তিনি ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন গত বছরের ১৩ আগস্ট। ভর্তি শেষে তাঁর ক্লাস শুরু হয়েছে গত ২২ জানুয়ারি।
অথচ একই শিক্ষাবর্ষে (২০২১-২২) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়েছে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর।
কেন ২২ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছভর্তি প্রক্রিয়াটি সহজ করা হচ্ছে না, জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটির কারণেই সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও তিনটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভালোভাবে এ কাজ করতে পারে, তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়কেও তা পারা উচিত। তাঁরা চান, ব্যবস্থাটি আরও শিক্ষার্থীবান্ধব হোক। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও আন্তরিক হতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন শিক্ষাবর্ষে এই ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা কবে, কীভাবে হবে, তা জানা যায়নি। তবে ইতিমধ্যে তারা একটি সভা করেছে। সেখানে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলো এবার আগামী জুলাইয়ের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
এই গুচ্ছে থাকা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. ছাদেকুল আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তাঁরা প্রাথমিকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র
এত গেল গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তি পরীক্ষার কথা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো পরীক্ষা ছাড়াই কেবল এসএসসি ও এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। কিন্তু তারা কয়েক বছর ধরে প্রতিবারই অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে ভর্তির কাজটি করে ফেলে। এ কারণে দেখা যায়, ভর্তি নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অসংখ্য শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে কলেজগুলোতে ভর্তি হয়ে থাকেন। এরপর যখন অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান, তখন সেই ভর্তি বাতিল করেন। তখন তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি বাতিলে টাকা ফেরতের কথা বললেও বাস্তবতা হলো সেই টাকা ওঠাতে শিক্ষার্থীদের কাঠখড় পোড়াতে হয়। তখন মাঝপথে কলেজের আসনও খালি হয়ে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আনতে না পারায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় এখনো একটি সুস্থির ভর্তিব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।






Visit Today : 168
Visit Yesterday : 2096
This Month : 2264
Hits Today : 1281
Total Hits : 3042343

