প্রশ্ন নিয়ে কেন এই দৈন্য

পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে একের পর এক অঘটন ঘটছে শিক্ষা বোর্ডগুলোয়। চলতি বছরে এসএসসি-এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্ন নিয়ে ঘটেছে নানা ধরনের বিপত্তি। ভুল প্রশ্ন সরবরাহ, প্রশ্ন ফাঁস, ভুল মুদ্রণ ও সবশেষ প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক উস্কানি। অতীতের ঘটনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও থামানো যাচ্ছে না প্রশ্ন নিয়ে কেলেঙ্কারি। করোনার   মহামারির জন্য ২০২০ সাল থেকে সময়মতো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিতে পারেনি সরকার। চলতি বছরে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যশোর শিক্ষা বোর্ডের ১৫ই সেপ্টেম্বর বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় নড়াইলের কালিয়া উপজেলার প্যারী শংকর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রথম পত্রের বদলে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। এরপর পুরো যশোর বোর্ডের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এরপর এই পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে কুড়িগ্রামের কিছু শিক্ষকের হাত ধরে। এই ঘটনায় চার শিক্ষকসহ পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মাকে শোকজ করা হয়। ভূরুঙ্গামারী থানায় প্রশ্ন বাছাইয়ের সর্টিং করার সময় নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার আব্দুর রহমানের যোগসাজশে বাংলা ১ম পত্রের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের ভেতর বাংলা-২য় পত্র, ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্রের প্রশ্নপত্রের একটি করে খাম ঢুকিয়ে নেন এবং প্যাকেট সিলগালা করেন। তার ওপর স্বাক্ষর করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান।

বাংলা ১ম পত্রের পরীক্ষার দিন যথানিয়মে থানা থেকে বাংলা ১ম পত্রের প্যাকেট এনে তা খুলে বাংলা ২য় পত্র, ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্রের খামটি কৌশলে সরিয়ে ফেলেন কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমানসহ তার সহযোগীরা। এ সময় কেন্দ্রে দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার বোর্ডের দেয়া তালিকা অনুযায়ী পাঠানো প্রশ্নপত্রের খাম গণনা করার নিয়ম থাকলেও তারা দায়িত্ব অবহেলা করে তা করেনি। পরে প্রধান শিক্ষক কয়েকজন শিক্ষকের সহায়তায় ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের হাতে লেখা উত্তরপত্র তৈরি করে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করেন। পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁস হওয়া উত্তর পত্রের সঙ্গে পরের দিন পরীক্ষার প্রদত্ত প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া যায়। আর এসব উত্তরপত্র অনেকেই মোবাইলের মাধ্যমে গোপনে ২শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় বিক্রি করেন অন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিকট। এই ঘটনায় সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানকে। এই ঘটনায় দিনাজপুর বোর্ডের ছয়টি প্রশ্ন বাতিলসহ চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। প্রশ্ন নিয়ে সমালোচনার জের কাটতে না কাটতেই দেশব্যাপী শুরু হয় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।

নভেম্বরে শুরু হওয়া এই পরীক্ষার শুরুর দিন থেকেই শুরু হয় প্রশ্ন নিয়ে জটিলতা। কারিগরি বোর্ডের অধীনে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা এক ঘণ্টা চলার পর স্থগিত করা হয় পরীক্ষা। পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড জানিয়ে দিলেও প্রকাশ করেনি কারণ। বোর্ড সূত্রে জানা যায়, নতুন সিলেবাসের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন পুরাতন সিলেবাসে আর পুরাতন শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন নতুন সিলেবাসে ছাপানো হয়। এই মুদ্রণে ভুলের কারণে স্থগিত হয় পরীক্ষা। আর প্রশ্ন নিয়ে মুদ্রণের এই ভুলের সমালোচনা শেষ হতে না হতেই নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্নে ধর্মীয় উস্কানির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই প্রশ্নে বলা হয়, নেপাল ও গোপাল দুই ভাই। জমি নিয়ে বিরোধ তাদের দীর্ঘদিন। অনেক সালিশ বিচার করেও কেউ তাদের বিরোধ মেটাতে পারেনি। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এখন জমির ভাগ বণ্টন নিয়ে মামলা চলছে আদালতে। ছোট ভাই নেপাল বড় ভাইকে শায়েস্তা করতে আব্দুল নামে এক মুসলমানের কাছে ভিটের জমির এক অংশ বিক্রি করে। আব্দুল সেখানে বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কোরবানির ঈদে সে নেপালের বাড়ির সামনে গরু কোরবানি দেয়।

এই ঘটনায় নেপালের মন ভেঙে যায়। কিছুদিন পর কাউকে কিছু না বলে জমি-জায়গা ফেলে সপরিবারে ভারতে চলে যায় সে। এই প্রশ্নটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এরই প্রেক্ষিতে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গতকাল। এতে বলা হয়, বাংলা প্রথমপত্রের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক প্রশ্নপত্রটি যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রণীত। প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িক উস্কানির সঙ্গে জড়িত প্রশ্নকর্তা ঝিনাইদহের মহেশপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার পাল। অপরদিকে প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে ছিলেন নড়াইলের সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তাজউদ্দীন শাওন, সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. শফিকুর রহমান, নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সহকারী অধ্যাপক শ্যামল কুমার ঘোষ এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা আদর্শ কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কমিটিও গঠন করেছে শিক্ষা বোর্ড। যশোর শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক কে এম রব্বানীকে তদন্ত কমিটিতে প্রধান করা হয়েছে। একই শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ও উপ-কলেজ পরিদর্শককে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এ কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাবে যশোর শিক্ষা বোর্ড। যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব বলেন, আমরা এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা চেয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছে ব্যাখ্যা চাইবো। এ ছাড়াও তদন্তে কোনো অপরাধ চিহ্নিত হলে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শাস্তির সুপারিশ করা হবে। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, আমাদের প্রশ্নপত্র তৈরির ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া থাকে যাতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন না রাখা হয়। বিষয়টা খতিয়ে দেখা হবে প্রশ্নকর্তা এই প্রশ্ন কেন করলেন? আর প্রশ্ন মডারেটরের দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা কেন এড়িয়ে গেলেন। আমরা তদন্ত শেষে বিষয়টি নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। প্রশ্নের এই অসঙ্গতি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের দেশ।

এ দেশে কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িক উস্কানির মতো কিছু থাকবে তা খুবই দুঃখজনক ও একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। মন্ত্রী বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের মনে যারা সাম্প্রদায়িক উস্কানির বীজ বপন করতে চায় তাদের ভবিষ্যতে এসব কাজের সঙ্গে আর সম্পৃক্ত করা হবে না। একইসঙ্গে যারা প্রশ্নপত্রে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হালিম বলেন, সময়ে সময়ে আমাদের কিছু বিষয়ের উদ্ভব ঘটছে। আমাদের কর্তৃপক্ষকে খুব সাবধানে বিষয়গুলো পরিচালনা করা উচিত। এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা এটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউই দায় এড়াতে পারেন না। যে নির্দেশনা ও নীতিমালা কেন বিঘ্ন ঘটলো এটি কি ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত তা খতিয়ে দেখতে হবে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থাকলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর যদি ইচ্ছাকৃত না হয় তারপরও কঠোর হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর যাতে না হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের শেষ ভরসার জায়গাটুকুও শেষ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরাই তো নতুন প্রজন্ম তৈরি করেন। তারাই যখন প্রশ্ন ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন ভরসা করবো কাকে? মূল্যবোধ ভুলে এখন শিক্ষকরা নিজ স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা হ-য-ব-র-ল। শিক্ষামন্ত্রী পেশাগতভাবে ডাক্তার, তবে তিনি ডাক্তারি করেন না। তিনি শিক্ষার দেখভাল করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সাধারণ আমলা। বঙ্গবন্ধুর আমলে শক্তিশালী আমলাকে শিক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই রামও নেই, অযোদ্ধাও নেই। কাজেই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর অনেক রয়ে গেছে। উপরন্তু যারা শিক্ষা দেখভালের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের দেশপ্রেম বা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ। সবকিছু মিলিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি সেকেলে আমলের। এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার মেধা যাচাই করা সম্ভব নয়। সরকারি কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন, তারা সরকারের পক্ষে ছাফাই গান, মাঝে মাঝে কিছু সমালোচনা করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধগুলো পড়ানো। তাহলে অনেকটা সমস্যার সমাধান হলেও হতে পারে।

Eadmin

Related post