শিক্ষকদের অবহেলায় পরীক্ষা দেয়া হলো না নাসিমার

শিক্ষকদের অবহেলায় শরীয়তপুরের সখিপুর থানার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল সৈয়লকান্দি গ্রামের নাসিমা আক্তারের দাখিল পরীক্ষা দেয়া হলো না। এদিকে প্রতিবন্ধী মেয়ে নাসিমার চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখে দিশেহারা বাবা-মা। কৃষক বাবার বহুকষ্টে জোগাড় করা অর্থ দিয়ে ফরম ফিলআপ করেও পরীক্ষা দিতে না পারায় ভেঙে পড়েছে নাসিমা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সহপাঠীরা যখন দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছে তখন নাসিমা দুপুরের খাবার তৈরিসহ বাড়ির নানা কাজে ব্যস্ত। আর এর জন্য দায়ী শরীয়তপুর জেলার সখিপুর থানার সোলাইমেনিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার দায়িত্বরত শিক্ষকরা। সখিপুর থানার সৈয়লকান্দি গ্রামের দিনমজুর কৃষক মজিবর মিঝির মেয়ে নাসিমা আক্তার। ১০ ভাইবোনের মধ্যে নাসিমা সাত নম্বর।

নাসিমা সোলাইমানিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার এবারের দাখিল পরীক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল ফরম ফিলআপের টাকা জমা দেয়ার শেষ তারিখ হলেও নাসিমা আক্তার ও তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সহপাঠী গত ১৪ এপ্রিল ফরম ফিলাপের ২৫০০ টাকা শ্রেণি শিক্ষক টিউলিজ রহমানের কাছে জমা দেয়। ওই মাসের শেষের দিকে মাদ্রাসায় প্রবেশপত্র আনতে যায় নাসিমা আক্তার। দেখে ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৫ জনের প্রবেশপত্র এসেছে। শুধুমাত্র তার প্রবেশপত্রটি আসেনি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনো উত্তর পায়নি। মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির কাছে গিয়েও মেলেনি কোনো প্রতিকার। পরে কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, তার প্রবেশপত্রটি আসেনি। আর এ বছর তার পলীক্ষা দেয়া হবে না।

নাসিমা আক্তার বলেন, আগামীতে চোখের সামনে সহপাঠীরা কলেজে যাবে। এটি আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। শিক্ষকদের এমন গাফিলতিতে আমার মতো একজন গরিব ঘরের মেয়ে যেকোনো সময় পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়তে পারে। আমরা দশ ভাইবোন। আমার ইচ্ছা ছিল দাখিল পাস করে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবো। একটি বছর লেখাপড়ার বিরতি আমার জীবনের কাল হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই আমরা চরাঞ্চলের মানুষ। যেখানে ছেলেদের লেখাপড়ারই কোনো নিশ্চয়তা নেই সেখানে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েও শিক্ষকদের অবহেলার কারণে এখন ক্ষতিগ্রস্ত। 
 
তিনি আরও বলেন, আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমার বাবা একজন কৃষক, অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে আমার ফরম ফিলআপের টাকা দিয়েছিলেন। শ্রেণি শিক্ষকের কাছে টাকা দেয়ার পরেও কর্তৃপক্ষ আমাকে ঠকিয়েছে। আমার টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমি তাদের বিচার দাবি করছি। 

নাসিমা আক্তারের মা বলেন, ‘আমার মেয়ের ভবিষ্যত যারা নষ্ট করে দিলো, তাদের আমি বিচার চাই। মেয়ের কষ্ট দেখে আমি সহ্য করতে পারছি না। ফরম ফিলআপ করেও প্রবেশপত্র পায়নি এ নিয়ে গত ১০ দিন মেয়ে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেনি। এত কষ্ট করে লেখাপড়া করার পরে যদি শিক্ষকদের কারণে এমন অবস্থা হয়, তাহলে লেখাপড়া করে কী লাভ।’

নাসিমা আক্তারের বাবা মজিবর মিঝি বলেন, ‘আমি একজন গরিব কৃষক। সাত মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে আমার। এত বড় সংসার চালাতেই আমার কষ্ট হয়। আর্থিক অনটনের কারণে কোনো সন্তানকেই লেখাপড়া করাতে পারিনি। অনেক কষ্ট করে আমার এ প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে ওর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে লেখাপড়া করিয়েছি। অথচ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে পারলো না। এখন ওর কী হবে। আমি লেখাপড়া না জানা মানুষ, কেউ আমাকে সহযোগিতাও করে না, আমি এর বিচার চাই।’

এ বিষয়ে শ্রেণি শিক্ষক টিউলিজ রহমান সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমি ওর কাছ থেকে ফরম ফিলআপের টাকা গ্রহণ করে সব টাকা মিলিয়ে মাদ্রাসা সুপারের কাছে জমা দিয়েছি। এরপর তারা কী করেছে সেটা আমি জানি না।’

অন্যদিকে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার আগে অন্য একজন সুপার ছিলেন তার কাছে টাকা দেয়া হতে পারে। আমি কোনো টাকা গ্রহণ করিনি। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পরে শুধুমাত্র দাখিল পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিয়েছি।’

এ বিষয়ে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মাহমুদুর রহমান বড়মিয়া বলেন, ‘নাসিমা আক্তার আমার কাছে গিয়েছিল কিন্তু সে সময় আমি তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নাসিমার কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করেছে এটা সত্যি। বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকদের বাড়াবাড়ি না করে একটা সমাধানে আসা উচিত।’

মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আবুল বাশার বলেন ‘শিক্ষকদের অবহেলা ও তাদের গাফিলতির কারণেই এ শিক্ষার্থীর আজ এই অবস্থা। মাদ্রাসার শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই মাদ্রাসাটি ধ্বংসের পথে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সঠিক ব্যবস্থা না নিলে নাসিমা আক্তারের মতো শিক্ষাজীবন নিয়ে বিপথগামী হবে আরও শিক্ষার্থী।’

এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার নাসিমা আক্তার শরীয়তপুরের ভেদেরগঞ্জ উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বরাবরে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে একটি আবেদনপত্র প্রদান করেন।

আবেদনের প্রেক্ষিতে ভেদেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন সময় সংবাদকে বলেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে একটি আবেদনপত্র পৌঁছালে বিষয়টি নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছি। আবেদনপত্রে শ্রেণি-শিক্ষক, মাদ্রাসার সুপার ও সভাপতির গাফিলতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এরমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছি।’
 
শিগগিরই তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দেয়া হবে বলে জানান তিনি। 

Eadmin

Related post