প্রাসঙ্গিকতায় শিক্ষার্থীদের ভর্তি যুদ্ধ

একটা কথা ভেবে আমি আশ্চর্য হই। আমরা অভিভাবকেরা যদি আমাদের সন্তানদের প্রকৃত পথের সন্ধান দেওয়ার চেষ্টা না করি, তবে তারা জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়ার জ্বালানি সংগ্রহ করবে কোথা থেকে? আমাদের সন্তানদের সব দিক থেকেই সুস্থ প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তাদের মাথায় ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দিই। যেমন আমাদের দেশে আমরা মা-বাবারা সন্তানদের আগেই এমন ধারণা দিই যে অমুক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই হবে। আর কোনো কারণে যদি সে সেই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারে, তবে আমরা তো মন খারাপ করিই পাশাপাশি আমাদের সন্তানেরাও এ পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়ে। আমি এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যারা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পেরে পড়াশোনার উৎসাহই হারিয়ে ফেলে। তখন আমরা শত চেষ্টা করেও আর তাদের পড়াশোনার সুস্থ-স্বাভাবিক মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারি না।২০২১ সালের ভর্তির সময় আমি দেখেছি, শুধু সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য নেত্রকোনা, আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়াসহ অনেক দূরের এলাকা থেকে শিক্ষার্থী আমাদের মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের এলাকায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খারাপ, এমনটা কিন্তু নয়। এই শিক্ষার্থীরা এখন অনেক কষ্টের মধ্যে আছে। শিক্ষার্থীরা তো কষ্ট করছেই, তাদের নিয়ে আসেন তাদের অভিভাবকেরা। তাঁদেরও অনেক কষ্ট হচ্ছে, সময়ও নষ্ট হচ্ছে। অথচ তাঁরা যদি তাঁদের সন্তানদের তাঁদের বাড়ির কাছের কোনো বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করতেন, তবে তাঁদের সময় বেঁচে যত, অর্থ বেঁচে যেতো, সর্বোপরি তাঁদের কষ্টও কমে যেত। আর এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সময়টা অনেকটাই বেড়ে যেতে। মজার বিষয় হলো এ সহজ কথাটি কাউকে শত চেষ্টা করেও বোঝানো যাবে না।

অথচ আমাদের সন্তানদের সামনে অনেক উৎসাহব্যঞ্জক উদাহরণ তুলে ধরার অনেক সুযোগ আছে। যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এবার প্রথম হয়েছে এক শ্রমজীবীর ছেলে মো. মুস্তাকীম। যে পড়াশোনার পাশাপাশি তার কাঠমিস্ত্রি বাবার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটের ও গুচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলাদেশের নামীদামি অনেক কলেজের হাজারো শিক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছে মাদ্রাসার দুজন শিক্ষার্থী। অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিজয়ী এসব উদাহরণ আমাদের সন্তানদের সামনে আমরা তুলে ধরি না। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মিফতাহুল আলম সিয়াম কিন্তু ঢাকার কোনো নামীদামি কলেজের শিক্ষার্থী ছিল না। সে তার এলাকার কলেজ থেকেই এইচএসসি পাস করেছে। সে নিজেই বলেছে যে প্রত্যেকের মধ্যেই থাকে সুপ্ত প্রতিভা, যাকে অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রস্ফুটিত করতে হয়। আর এ কাজ করতে পেরেই সে আজ দেশসেরা শিক্ষার্থীর স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে চাই না। আমাদের সন্তানদের সামনে এসব উদাহরণ তুলে ধরে তাদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করি না। আমরা সফলতার শর্টকাট পথ খুঁজে বেড়াই, যা কোনোমতেই ঠিক নয়।

Eadmin

Related post