নারী জাগরণের আরো এক নাম ‘আলেয়া’
সম্প্রতি কথা হয় নাসিমা ও হালিমার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তাঁরা জানান, পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁরা এখন ভালোই আছেন। সেদিন আলেয়া খাতুন তাঁদের পাশে এসে না দাঁড়ালে হয়তো বাঁচতেনই না।
আলেয়ার (৪৮) বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শ্রীফলতলা গ্রামে। তিনি মানুষকে আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তাঁদের সদুপদেশ দেন, স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করেন। এই কাজে একাই তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। নারীদের নিয়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক করেন।
আত্মহননের নেতিবাচক দিক নিয়ে বলেন। নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন ইতিবাচক কাজে। ১৪ বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে কাজটি করে চলেছেন আলেয়া। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষকে জীবনাবসানের পথ থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন। একই সময়ে ৬ হাজার মানুষকে আত্মহত্যার কুফল সম্পর্কে জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন আলেয়া। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আলেয়াকে ‘মানুষের জন্য মানবাধিকার’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
কে এই আলেয়া
আলেয়া খাতুন ঝিনাইদহ শহরের আরাবপুর এলাকার আনছার আলীর মেয়ে। মাত্র ১০ বছর বয়সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কারণে আলেয়ার পড়া আর এগোয়নি। শ্রীফলতলা গ্রামের শাহাদত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সংসারে শাহানাজ খাতুন, সাজেদুল হক, মাজেদুল হক ও নাসরিন আক্তার নামে তাঁর চার সন্তান রয়েছে।
আলেয়া জানান, শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রায়ই তাঁর গায়ের রং নিয়ে নানা কথা শোনাতেন। প্রায় ৩০ বছর আগে একবার শ্বশুরবাড়িতে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেবার কোনোরকমে বেঁচে যান। ১৮ বছর আগেও আরেক দফা আত্মহননের চেষ্টা করেছিলেন। সে যাত্রাও বেঁচে যান। তারপর আরও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন আলেয়া।
সেবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন ঝিনাইদহ-মাগুরা মহাসড়কের কাছে। সড়কের পাশে হাটগোপালপুর বাজারে পরিচয় হয় মাহফুজা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মী ছিলেন। এক-দু কথায় আলাপ জমে দুজনের। আলেয়ার সব কথা শুনে মাহফুজা তাঁকে বাঁচার কথা বলেন, ভুলে যেতে বলেন অন্ধকার সেই পথ।
সেদিন বাড়ি ফেরার পর অনেকখানি বদলে যান আলেয়া। দিন কয়েক পর মাহফুজা বেগমকে খুঁজে বের করেন। ঘৃণিত পথ ছেড়ে ভালোভাবে বাঁচতে চান—সেই আকুতি জানালেন আলেয়া। মাহফুজার সংগঠনের পক্ষ থেকে আলেয়ার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো। এখান থেকেই আলেয়া বাঁচার ও বাঁচানোর পথ খুঁজে পান।
উঠান বৈঠকে যা বলেন আলেয়া
আত্মহত্যা প্রতিরোধে উঠান বৈঠকগুলোতে আলেয়া সবাইকে বলেন, আত্মহত্যা অপরাধ, আত্মহত্যা কখনো কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বেঁচে থেকে সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। মানুষের জীবনে খারাপ সময় আসতেই পারে, এ জন্য হতাশ হলে চলবে না। সব সময় সংগ্রামী মনোভাব আর ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
আলেয়ার কথায়, নিজের জীবনে কোনো সমস্যা দেখা দিলে মা–বাবা বা বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। মা–বাবার কথা ভালোভাবে নিতে হবে। নিজেকে কখনো ছোট ভাবা যাবে না, নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সব সময় ভালো কাজ করতে হবে, খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
সামাজিক অসামঞ্জস্য নিয়েও সচেতনতামূলক কথা বলেন আলেয়া। তিনি বলেন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক দেওয়া-নেওয়া ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে।
আলেয়ার কাজের পরিধি
আলেয়া জানান, প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০৮ সালে মাঠে নামেন। তাঁর গ্রাম শ্রীফলতলা ছাড়াও পাশের হাটগোপালপুর, ভোমরাডাঙ্গা, পূর্বপাড়া, রামনগর, লৌহজং, সুতলিয়া, সমসপুর, পদ্মকর, ভাদড়া ও পুটিয়া গ্রামে উঠান বৈঠক করতে থাকেন। নারীদের নিয়ে উঠান বৈঠকে আত্মহত্যার খারাপ দিকগুলো তুলে ধরেন। মাসে কমপক্ষে ১৫ দিন এভাবে নানা স্থানে উঠান বৈঠক করেন। এসব পরামর্শের বিনিময়ে কখনো টাকা নেন না আলেয়া। তাঁর হিসাবে, গত ১৪ বছরে ১০ গ্রামের কমপক্ষে ৬ হাজার নারীকে নিয়ে তিনি উঠান বৈঠক করেছেন।
আলেয়া জানান, ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের একটা সাধারণ প্রবণতা, সামান্যতেই আত্মহত্যা করে বসেন। এটা বুঝেই তিনি কাজ শুরু করেছিলেন, পরিবারে গোলমাল হয়েছে শুনলেই ছুটে যান। ওই পরিবারের পাশে দাঁড়ান।
হাটগোপালপুর গ্রামের রাজিয়া সুলতানা বলছিলেন, আলেয়ার জন্য তাঁরা ভালোভাবে বাঁচতে শিখেছেন। এখন তাঁরা পরিবার থেকে নির্যাতনের শিকার হন না, হলেও প্রতিবাদ করেন। লৌহজং গ্রামের রাবেয়া খাতুন জানান, এখন তিনি আত্মহত্যার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেন না। তাঁরা নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে শিখেছেন। এসবই হয়েছে আলেয়ার কারণে।
জনপ্রতিনিধি ও অন্যরা যা বললেন
ঝিনাইদহ আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকা। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শোভার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জেলায় ৩ হাজার ৮৯০ জন আত্মহত্যা করেছেন। এই সময়ের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন প্রায় ২৬ হাজার নারী-পুরুষ।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, নানা কারণে নারীরা বেশি আত্মহত্যা করেন। তাঁদের সংগঠন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আলেয়া আত্মহত্যা রোধে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর কারণে ঝিনাইদহের পূর্বাঞ্চলে আত্মহত্যা কমে এসেছে।
আলেয়ার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে পদ্মকর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিকাশ বিশ্বাস বলেন, আলেয়া খাতুন দীর্ঘদিন নারীদের নিয়ে কাজ করছেন। এটা খুবই ভালো কাজ। ইতিমধ্যে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। তাঁর এই কাজে নারীরা এগিয়ে যাবেন—এটা প্রত্যাশা করেন এই চেয়ারম্যান।






Visit Today : 258
Visit Yesterday : 2096
This Month : 2354
Hits Today : 1742
Total Hits : 3042804


