আজ আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস~ জলবায়ুর বাঁকবদল জলে-স্থলে
তামাম বিশ্বের জলবায়ুর বাঁকবদলের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এখন আর ঋতু মেপে বর্ষায় বৃষ্টি ঝরে না, শীতকাল এলেও অনুভূত হয় না তেমন ঠান্ডা। সবকিছুই যেন এলোমেলো। বর্ষা আসে ধীর পায়ে, বিদায়ের সুরও বাজে দেরিতে। আবার শীত মৌসুমেও দেখা যায় তাপের বাড়াবাড়ি। তাপপ্রবাহও বেহিসাবি। এই যেমন– গেল এপ্রিলে আবির্ভাব হওয়া গরমের রুদ্ররূপ এখনও শরীরে হুল ফুটিয়ে যাচ্ছে। মে মাসেও প্রবল গরম জারি রেখেছে তার প্রতাপ। গত ৩০ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস; বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এবারের এপ্রিলে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহ প্রথম ধাপে চলেছে টানা ৩৬ দিন, তা গত ৭৬ বছরে দেখা যায়নি। এতে সবচেয়ে হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।
কমছে পানির স্তর, বাড়ছে লবণপানির আগ্রাসন। ফলে মিঠাপানিনির্ভর বৃক্ষ ও মাছ মারা পড়ছে। অতিরিক্ত গরমে পানিতে থাকা জীববৈচিত্র্যের জীবনধারাও বদলে যাচ্ছে। সামুদ্রিক শৈবালসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে সাগরে কমে যাচ্ছে অক্সিজেন। এ কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক মাছ।
এ পরিস্থিতিতে আজ বুধবার প্রতিবছরের মতো বাংলাদেশে নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। তাপপ্রবাহ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীভাঙন, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, বহু বন্যপ্রাণীর সংকটাপন্ন অবস্থায় চলে যাওয়া– সব মিলিয়ে এবারের দিবসটি বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে। এ উপলক্ষে বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবং মানুষের আগ্রাসনের ফলে বিশ্বের নানা প্রজাতির প্রাণীর এক-পঞ্চমাংশের বেশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এবং লিভিং প্লানেট ইনডেক্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দেখা গেছে, বিশ্বের ১ হাজার ১৮৯ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশের সংখ্যা কমে গেছে। এদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে পারে– এমন শঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের এ হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারকে কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সে সম্পর্কে খুব স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য মাইগ্রেটরি স্পিসিজ অব ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল সংরক্ষণের নির্বাহী সচিব অ্যামি ফ্রেঙ্কেল বলেছেন, এটি নিয়ে শুধু ভাবলেই চলবে না; বাস্তবায়নে এখন থেকেই কাজ করে যেতে হবে। জাতিসংঘের বিলুপ্তির তালিকায় থাকা প্রাণীদের ৭০ শতাংশ প্রজাতিকে প্রভাবিত করে শিকারসহ মানুষের নানা ক্রিয়াকলাপ। এসব প্রাণীর জন্য মানুষই সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, দাবানলও প্রাণীর মৃত্যু বা বিলুপ্তি হওয়ার অন্যতম কারণ।
লবণাক্ততা বাড়ছে
অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে লবণাক্ততা বাড়ায় কম লবণসহিষ্ণু গাছগাছালি মারা যাচ্ছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদনদীর লবণাক্ততা নিয়ে ২০২০ সালে গবেষণা করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন (বিভাগ)। ফলাফলে দেখা যায়, পশুর নদে ২০২০ সালে শুষ্ক মৌসুমে গরমে লবণাক্ততার সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৬ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড)। যদিও ২০১০ সালে তা ছিল ১৭ দশমিক ৫ পিপিটি। গবেষকরা জানান, সাধারণভাবে উপকূলীয় এলাকার নদীতে লবণাক্ততা থাকার কথা দুই থেকে পাঁচ পিপিটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমায় অনেক আগে থেকেই সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা ছাড়িয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পলিমাটি। ২০১৩ সালে পশুর নদের হাড়বাড়িয়া এলাকায় পলির পরিমাণ ছিল ৯ সেন্টিমিটার। ২০১৯-২০ সালে তা ২২ সেন্টিমিটারে দাঁড়ায়। নদের করমজল এলাকায় এক দশক আগে ১৯ সেন্টিমিটার পলি থাকলেও এখন বেড়ে ৩৯ হয়েছে।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা আ স ম হেলাল সিদ্দিকী জানান, তারা সুন্দরবনকে স্বল্প, মধ্য ও উচ্চ লবণাক্ত এলাকায় ভাগ করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বনের সর্বত্র উচ্চ লবণাক্ত হয়ে গেছে। কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরী, পশুরসহ ১০টি গাছের চারা গজানোর হার কমেছে। বনের গাছ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গেওয়াগাছ অনেক বাড়ছে। ১৯৮৫ সালে বনে ১৬ শতাংশ থাকলেও এখন বনের ৫০ শতাংশই গেওয়াগাছ। গেওয়ার পাতা ও বীজে আঠা থাকায় হরিণ বা অন্য প্রাণী খায় না। এতে বন্যপ্রাণীর ওপরও প্রভাব পড়ছে।
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় আচার্য্য বলেন, বনে জলাভূমির পাশে আগের মতো লতাগুল্ম জন্মাতে পারছে না। লবণাক্ততা বাড়ায় বন্যপ্রাণীর ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে, তা জানতে এবং এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন।
জলেও তাপমাত্রার থাবা
গত ১০ মে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মাসিক প্রতিবেদনে ইউরোপের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের (সিথ্রিএস) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, গত এপ্রিল ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রার উষ্ণতম রেকর্ডে টানা ১১তম মাস। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১৩ মাস ধরে অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এপ্রিলে ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ ও ৬০ ডিগ্রি উত্তরের গড় ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওই মাসের রেকর্ডে সর্বোচ্চ। তবে গত মার্চের রেকর্ড ২১ দশমিক শূন্য ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে সামান্য কম। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি। অতি উত্তপ্ত মহাসাগরগুলো সামুদ্রিক জীবনচক্রেও প্রভাব ফেলছে। প্রবাল ব্লিচিং শুরু হয়েছে। অথচ বহু দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মহাসাগরগুলো পৃথিবীর ‘গেট আউট অব জেল কার্ড’ হিসেবে কাজ করছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়ে, সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বেড়ে যায়। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ায় কয়েক মাস ধরে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন জায়গায় জেলিফিশের আধিক্য বেড়েছে। এটিকে জেলিফিশ ব্লুম বলা হয়। জেলিফিশকে ‘ফিশ’ বলা হলেও এটি মাছ নয়, এক ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী। পৃথিবীর সব সাগর, উপসাগর ও মহাসাগরে জেলিফিশ রয়েছে। বিশ্বজুড়ে সাগর-মহাসাগরে সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মে বেশি জেলিফিশ ব্লুমের ঘটনা ঘটে। কারণ, উষ্ণ জলের তাপমাত্রা জেলিফিশকে দ্রুত যৌন পরিপক্বতায় পৌঁছায় এবং অবিশ্বাস্য গতিতে উচ্চ প্রজনন ঘটায়। মহাসাগরের তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি জেলিফিশের সংখ্যা বাড়াতে অবদান রাখছে। যখন সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন মাছ সেই নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না, জায়গা বদল করে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে লবণাক্ততা বেড়ে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনাচারে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রভাব প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছে মানুষ। এর প্রভাব আমাদের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ভবিষ্যতে।
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ বলেন, সাগরের স্যামন মাছ বিপন্ন হবে। কারণ যেসব নদীতে ঢুকে তারা ডিম ছেড়ে পোনার জন্ম দেয়, সেগুলোর পানি গরম হয়ে যাচ্ছে। এতে সাগরের প্রবাল উধাও হয়ে যেতে পারে। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড সাগরের পানিতে মিশে পানির এসিডের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।






Visit Today : 448
Visit Yesterday : 262
This Month : 2806
Hits Today : 1837
Total Hits : 3044729

