০১ বার নয় ০২ বার নয় ১৭ বারে সে ঠিকই সফল

 ০১ বার নয় ০২ বার নয় ১৭ বারে সে ঠিকই সফল

অন্যের বাড়িতে কাজ করে পড়ালেখা করতেন বাংলাবান্ধার পবিত্রী রায়। এইচএসসির পর মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় কোচিং করার সুযোগ পান। চলে যান ঢাকা। কিন্তু কোচিংয়ের পরীক্ষাগুলোতে ভালো না করায় এ সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যায়। অগত্যা পবিত্রীর ঠিকানা হয় রাজশাহীতে, ভাই গোপাল রায়ের কাছে। তাঁর সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় শুরু করেন প্রস্তুতি। সেবার সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কোথাও সুযোগ পাননি তিনি।

প্রথমবার প্রস্তুতির খরচ জোগাতেই হতদরিদ্র পরিবারটি দিশেহারা, তাদের পক্ষে দ্বিতীয়বার খরচ দেওয়া ছিল কল্পনাতীত। বাধ্য হয়ে পবিত্রী নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে কাজ নেন। এ ক্ষেত্রে বোনকে রাজি করানো, মানসিক সমর্থন দেওয়া—পুরো কাজটা করেন গোপাল রায়। গোপাল রায় বলছিলেন, ‘ইপিজেডে যাওয়ার কথা ভাবতেই পবিত্রী কাঁদতে লাগল। লজ্জাও পাচ্ছিল। আমি ওকে বললাম, কাজ করে খেতে লজ্জা নেই। আমাদের মা–বাবা বাংলাবান্ধায় শ্রমিকের কাজ করে, তাদের সন্তান হয়ে আমাদের কিসের এত লজ্জা! পরদিন ভোরে সে নিজেই মাকে ডাকল। মা রান্না করে খাইয়ে পাঠিয়ে দিল। ১৫ দিনের প্রশিক্ষণসহ দুই মাসে তখন সে ৯ হাজার টাকা আয় করে।’

টাকাপয়সার বন্দোবস্ত যখন মোটামুটিভাবে হলো, সবকিছু ছেড়ে আবার পড়ালেখায় মন দেন পবিত্রী। নিজেই প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিলেন। প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর গুচ্ছের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-১ উপ-ইউনিটের পরীক্ষায় ১৩তম হয়ে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

পবিত্রীর এ সাফল্য আনন্দে ভাসিয়েছে তাঁর পরিবারকে। ভাই গোপাল রায় তো মহাখুশি হবেনই, বোনকে ঘিরে তাঁর স্বপ্ন যে কম নয়। এই খুশি স্মৃতিময় করে রেখেছেন বোনকে ১০০ বই উপহার দিয়ে। গোপাল রায় বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত পুরোটা সময় লড়াই, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে আমার বোন। ১৬টি ভর্তি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পেলেও সে দমে যায়নি। ১৭ বারে সে ঠিকই সফল হয়েছে। এই যে এত ঝড়ঝাপটার মধ্যে থেকেও সে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছে, চেষ্টা করে গেছে, তার জন্য আমার জায়গা থেকে ভালোবেসে ১০০ বই উপহার দিয়েছি।’

বইগুলো মূলত শিল্প–সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও খেলাধুলাবিষয়ক। এ ছাড়া জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তির বই যেমন আছে, একইভাবে মনীষীদের জীবনী, আত্মজীবনীমূলক বইও বোনকে উপহার দিয়েছেন। গোপাল বলেন, ‘বইগুলো সবই নতুন। এগুলোর মোট মূল্য হবে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অবশ্য বইগুলো আমাকে কিনতে হয়নি। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে এসব পেয়েছি।’

এতগুলো বই উপহার হিসেবে পেয়ে আপ্লুত হয়েছেন পবিত্রী রায়। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগেই ঝড়ে বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় দাদার পাঁচ শতাধিক বই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে দাদার মন খারাপ। তার ওপর একাডেমিক পড়ালেখা, লেখালেখি নিয়ে অনেক চাপে থাকেন। এ জন্য কোনো কিছু চাইব, তা কল্পনাও করিনি। কিন্তু দাদা নিজেই অবাক করে জানালেন, আমাকে ১০০ বই উপহার দেবেন। এমন উপহার পেয়ে আমি সত্যিই অনেক খুশি হয়েছি।’

গোপাল রায় পড়ালেখা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগে। পড়ালেখার গুরুত্ব তিনি বোঝেন। বলছিলেন, ‘আমার মা পঞ্চগড় জেলার বাংলাবান্ধায় প্রচণ্ড রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পাথরভাঙা শ্রমিকের কাজ করেন। নিজের চোখে শ্রমিকের কষ্ট দেখেছি। এতটা কষ্ট করেও তারা সময়মতো মজুরি পান না। যা পান, তাতে তিনবেলা খাওয়া, সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সমাজ মেয়ে শ্রমিকদের খারাপ চোখে দেখে, আজেবাজে ভাষায় অনেকে কথা বলে। সেখান থেকে বোনকে শিক্ষিত করার তাগিদটা তৈরি হওয়া।’

Eadmin

Related post