স্কুলে ফেরাতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা হচ্ছে

স্কুলে ফেরাতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের তালিকা হচ্ছে

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সবেমাত্র মাধ্যমিকে পা রেখেছে সাইফুল। নতুন বইয়ের পাতা উল্টে-পাল্টে দেখার আগেই মহামারি করোনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে প্রিয় বিদ্যালয়। একদিকে বিদ্যালয় বন্ধ, অন্যদিকে বাড়িতে পড়ানোর কেউ নেই। অনলাইন কিংবা টেলিভিশনে পাঠদানের যে ব্যবস্থা সরকার করেছে সে সুযোগও তার আওতার বাইরে। যে কারণে পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত গ্রাম কমলাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী আপাতত পড়াশুনা গুটিয়ে বাবার কাজের সহযোগী হয়েছে।

এই ঝরে পড়া কিংবা বিদ্যালয়ে না ফেরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত হতে পারে তার একটি জরিপ শুরু করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাধ্যমিকেও চলছে কাজ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঝরে পড়ার হার চিহ্নিত করা গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এসব শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন সারাদেশে আট থেকে ১৪ বছর বয়সী ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি জরিপ শুরু করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। যেসব এলাকায় বিদ্যালয় বর্হিভূত শিশু রয়েছে তার একটি ম্যাপিং করে শিক্ষার্থী যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর জরিপ যাচাই-বাছাই করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী চিহ্নিত করা হবে।

জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি- ৪)-এর আওতায় আউট অব স্কুল চিলড্রেন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই)। রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক -২) ছাড়া দেশের ৬৪ জেলার ৩৪৫টি উপজেলায় এবং সব সিটি করপোরেশনসহ ১৫টি শহর এলাকায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। রস্ক বাস্তবায়নে কৌশল অনুযায়ী শিশু নির্বাচন কমিটির (ক্যাম্পেইন কমিটি) সভাপতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা জরিপ কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এত দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে ঝরে পড়ার হার বাড়বে এটা ধরেই নিয়েছি। কারণ তারা দেড় বছর ধরে ক্লাস করতে পারছে না। স্কুল-কলেজের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক নেই। অনেক দরিদ্র শ্রেণি বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের বাল্য বিয়ে হচ্ছে। এটা আমাদের কানে আসছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি শহর এবং গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশুনায় বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। শহরের অভিভাকরা নিজেরা পড়াচ্ছে। আবার অনলাইনে ক্লাসের সুযোগ পাচ্ছে। গ্রামে তো সে সুযোগ নেই। যে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে সে অভিভাবকের কাছে পড়তে পারছে না। আবার অনেকে অনলাইন কিংবা অভিভাবক কারও সহযোগিতাই পাচ্ছে না। সেজন্য আমরা শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এর কারণ শিক্ষার্থীরা যাতে স্কুলের সংস্পর্শে থাকে। বৈষম্য কমিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার স্রোতের মধ্যে আনার জন্যই এই উদ্যোগ।’

অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্টের উছিলায় যদি ছেলে-মেয়েগুলো পড়াশুনার ট্রাকে ফিরে আসে- সেজন্য এই উদ্যোগ। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপের পাশাপাশি পড়াশুনার তাড়না থাকবে। এই অ্যাসাইনমেন্ট পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। যেমন ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবে আবার সেভেন থেকে এইটে উঠবে। আমরা পরীক্ষা নিতে না পারলে তখন অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের একটি সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় কথা অ্যাসাইনমেন্টের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা সবার সহযোগিতা গ্রহণ করুক। পড়াশুনার মধ্যে থাকুক। এ কারণে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে।’

অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই না। সারাবিশ্বের পরিস্থিতি একই। কেউ পাবলিক পরীক্ষা নিতে পারছে না। আজ আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তাতে কারও হাত নেই। আমাদের সব পরিকল্পনা ভেসতে গেছে। আমি অভিভাবকদের বলব, আপনারা নিজের সন্তানকে সময় দিন। তাদের পাশে থাকুন। সুসময় একদিন ফিরবেই।’