শিক্ষার মধ্যে চিন্তার চর্চা

শিক্ষার মধ্যে চিন্তার চর্চা

সক্রেটিস সব সময় বলতেন, তিনি কিছুই জানেন না। এই না জানার অনুভূতি নিয়ে তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে মানুষটা কিছুই জানে না। কিন্তু বাস্তবে কোনো বিষয়ে উত্তর দেওয়া যতটা সহজ, প্রশ্ন করা ততটা কঠিন। প্রশ্ন করতে করতেই প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সে-ই প্রশ্ন করতে জানে, যার ভেতরে জ্ঞান থাকে, যদিও বিষয়টা অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে। তবে সক্রেটিস বলতেন, জীবন তখনই সার্থক, যখন তুমি জানো যে তুমি কী করছো, কেন করছো এবং কী উদ্দেশ্যে করছো। জ্ঞানহীন, কর্মহীন, উদ্দেশ্যহীন জীবন কেবল গবাদি পশুর জন্য; মানুষের জন্য নয়।

ক্যারোফন সক্রেটিসের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন, তবুও তাঁর কাছে সক্রেটিসের জ্ঞানের বিষয়টি অমীমাংসিত প্রশ্নের মতো ছিল। ক্যারোফন একদিন জ্ঞানী ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ডেলফির ওরাকলের কাছে গেলেন। ক্যারোফন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কেউ আছে কি? ওরাকল সরাসরি না সূচক উত্তর দিলেন এবং খুব দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘সক্রেটিসের চেয়ে কেউই জ্ঞানী নয়।’

ক্যারোফন বিষয়টি সক্রেটিসকে জানালে তিনি কোনোভাবেই এটি বিশ্বাস করতে পারলেন না। কারণ তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন- তিনি কিছুই জানেন না। এই বিশ্বাস থেকে এলো বিস্ময়। তিনি অবাক হলেন, এত কম জেনে তিনি কীভাবে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী হলেন! এটা কি তাঁর বিনয় ছিল নাকি বিশ্বাস- সে প্রশ্ন অবান্তর। তিনি আসলেই জ্ঞানী কিনা, সেটা জানার জন্য বছরের পর বছর ধরে তিনি মানুষকে প্রশ্ন করতে থাকলেন- তাঁর চেয়ে জ্ঞানী কেউ আছে কিনা? দর্শনের ধারণাটাই এমন, যেটা মানুষকে বুঝতে দেয় না, তার ভেতরে কী আছে। অথচ যেটা নেই, সেটাই আছে- এমন অদৃশ্য জ্ঞানটাই দর্শন আর যে বোকা মানুষটা সেটা তার চিন্তার ভেতরে বয়ে নিয়ে বেড়ায়, সেই ব্যক্তিই দার্শনিক। যাই হোক, মানুষকে প্রশ্ন করতে করতে তিনি ওরাকলের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারলেন। ওরাকল যে ভুল বলেননি, সেটি তাঁর কাছে পরিস্কার হলো। দর্শন হুট করেই কোনো কিছু মেনে নেয় না; বরং এর ভেতরের গভীর সত্যকে যতদিন টেনে বের করে আনতে না পারে ততদিন সেটার অস্তিত্ব মানতে উৎসাহী হয় না। সাধারণ মানুষকে যদি জ্ঞানী বলা হতো, তবে সে খুব সহজেই মেনে নিত যে সে জ্ঞানী। কিন্তু সে প্রকৃত জ্ঞানী কিনা, তার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করত না; বরং তার স্বীকৃতিকে সে তার নিজের প্রচারের কাজে লাগাত। সে কখনও নিজেকে ছোট করে ভাবতে পারত না, বরং সে অন্যের চেয়ে বড়- সেটা বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করত। এ কারণেই আমাদের সমাজে বিশেষণের কমতি নেই। অথচ সে বিশেষণ যে মানুষটার ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই মানুষটা তার কতটুকু বহন করছে- এর কোনো যৌক্তিক বিশ্নেষণ নেই। সমাজে সুবিধাবাদী মানুষ বাড়ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে তেলবাজ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এর ফলে একটা মুষড়ে পড়া ফুটবলের ভেতরে বাতাস ঢুকিয়ে তাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ তার স্বার্থে এই বিশেষণের বোঝা টেনে মিথ্যে আনন্দে মাতছে, আবার কেউ তার স্বার্থ উদ্ধারে এই বিশেষণ তার চেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির ওপর বর্ষণ করছে। যদিও উভয়ই জানে এই বিশেষণ বাস্তব নয়, কাল্পনিক এবং পারস্পরিক স্বার্থ দ্বারা তাড়িত। কিন্তু কৌশলগত কারণে এ ধরনের কাজকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ধরনের অতিমাত্রার অভিনয়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ ক্ষমতা আর জ্ঞান এক নয়। ক্ষমতা থাকলেই জ্ঞানী হওয়া যায় না, জ্ঞান থাকলেই ক্ষমতাধর হওয়া যায় না। আমরা সভ্য চোখে যে তন্ত্রের কথাই বলি না কেন, সব তন্ত্রের ক্ষমতা চলে লাঠির ওপর ভর করে। জ্ঞানের কোনো লাঠি থাকে না, চিন্তাশক্তি থাকে। জ্ঞান যদি ফুলের সুবাস হয়, ক্ষমতা হলো ফুলের কাঁটা। পৃথিবীতে লাঠির দাম আছে, চিন্তার কোনো দাম নেই। তারপরও ক্ষমতা সব সময় জ্ঞানকে ভয় পেয়েছে। কিন্তু জ্ঞানের কোনো লাঠি না থাকায় ক্ষমতার লাঠিতে জ্ঞানকে বারবার পিষে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, ক্ষমতা বদল হয়, জ্ঞানও বদলে যায়। তবে ক্ষমতার পতন ঘটলেও জ্ঞানের পতন ঘটে না।

সক্রেটিস বুঝেছিলেন, কোনো একটা নির্দিষ্ট কাজের বিশেষায়িত জ্ঞান মানুষ রাখতে পারে, তবে পুরো জীবন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা খুব কম লোকেরই থাকে কিংবা নেই। রং মিস্ত্রি তাঁর রঙের কাজটা ভালো বোঝেন। সৈনারা যুদ্ধ করার কৌশলগুলো খুব ভালো জানেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ধারণার মধ্যে জ্ঞানকে বন্দি করে প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া যায় না। কোনো কাজের পদ্ধতি অনুসরণ করা জ্ঞান নয়, বরং জ্ঞান অনুধাবনের বিষয়। সক্রেটিস জ্ঞান ও সত্যকে অভিন্ন বলে মনে করতেন। জোহান ওল্কম্ফগ্যাং ভন গোথে বলতেন, জ্ঞান শুধু সত্যের মাঝেই পাওয়া যায়। এজন্যই হয়তো তাঁর মধ্যে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী ও কূটনীতিবিদের মতো বহুমুখী গুণাবলির জন্ম হয়েছিল। সে অর্থে জ্ঞানের বহুমাত্রিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, মানুষের মধ্যে ততই বহুমাত্রিক জ্ঞানের প্রবণতা কমছে। যদিও বর্তমান সময়ে বহুমাত্রিকতার ধারণা মানুষের গবেষণার মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে। তবে শিক্ষা যত বিশেষায়িত হয়ে পড়ছে, মানুষের জ্ঞানের সম্প্রসারিত রূপকে তত নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। এখন সময় এসেছে শিক্ষাকে সেভাবে সাজানোর, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সুপ্ত থাকা বহুমাত্রিক জ্ঞানের প্রতিভাকে বের করে আনা যাবে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো বহুমুখী প্রতিভার মানুষদের জীবন, কর্ম ও চিন্তাকে গবেষণার মাধ্যমে বিশ্নেষণ করে শিক্ষার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করতে হবে। যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। বর্তমান সময়ের গবেষকরা বলছেন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ভাবনা তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েকশ বছর এগিয়ে ছিল। তিনি নিজের ভাবনা নোটবুকে লিখে রাখতেন। সে লেখাতেও ছিল অদ্ভুত ভাবনার প্রতিফলন।

উল্টোভাবে ইতালির ভাষায় লেখা ভাবনাগুলোর পাঠোদ্ধার করতে প্রয়োজন হতো আয়নার। ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালিতে জন্ম নেওয়া মানুষটি ভাবনার বৈচিত্র্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

চিন্তা একমাত্রিক কিংবা বহুমাত্রিক হতে পারে। একমাত্রিক চিন্তার মধ্যে কোনো একটি বিশেষ জ্ঞানের বহুমাত্রিক ধারার বিকাশ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে বহুমাত্রিক চিন্তা কোনো একটি বিশেষ জ্ঞানের ওপর না হয়ে বিভিন্ন জ্ঞানের ভিন্ন মাত্রিকতার সমন্বিত চিন্তা বিকশিত করতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারেন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন। ‘লাস্ট সাপার’, ‘ভার্জিন অব দ্য রকস’ আর ‘মোনালিসা’র মতো বিস্ময়কর ছবি এঁকে তিনি পৃথিবীকে বিমোহিত করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর চিন্তার জগৎকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং চিন্তার বহুমাত্রিক ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়ে ক্রমাগত চিন্তার চর্চার মাধ্যমে এর বিকাশ ঘটিয়েছেন। উদ্ভাবন, চারুকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্যবিদ্যা, বিজ্ঞান, সংগীত, গণিত, প্রকৌশলবিদ্যা, সাহিত্য, অ্যানাটমি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ইতিহাসচর্চা ও মানচিত্রাঙ্কন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে বিচরণ করেছেন। অ্যানিমোমিটার, প্যারাসুট, অর্নিথপটার, এরিয়াল স্ট্ক্রূ, ট্রিপল ব্যারেল ক্যানন, বৃহদাকৃতির ধনুক, সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক, ৩৩ ব্যারেলের অর্গান, ঘূর্ণায়মান ব্রিজ, কলোসাস, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, রোবটিক নাইটের মতো বিস্ময়কর ধারণা তাঁর চিন্তাশক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে রোবটের ধারণা মানুষকে দিতে পেরেছেন। তবে আধুনিককালে আমরা রোবট বলতে যা বুঝি, লিওনার্দোর রোবট ঠিক তেমন ছিল না।

নিজে নিজে কাজ করতে পারে এমন একটি যন্ত্র তিনি তৈরি করেছিলেন, যার নাম রেখেছিলেন অটোম্যাটন। মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই এটি নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারত। ১৪৯০ সালের মাঝামাঝি ভিঞ্চি রোবট বানাতে সক্ষম হন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল মেকানিক্যালনাইট। এটি নিজে নিজে উঠতে ও বসতে পারত এবং নিজের হাত নাড়াচাড়া করতে পারত।

শিক্ষার মধ্যে চিন্তার চর্চাকে কীভাবে প্রবেশ করানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। চিন্তার চর্চায় চিন্তার ভিন্নতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে মানুষে মানুষে চিন্তার ভিন্নতা থাকতে পারে। চিন্তার ভিন্নতা বহুমাত্রিক শিক্ষার শক্তি হয়ে উঠতে পারে, যা মানুষকে তার সময়ের চেয়েও বেশি এগিয়ে রাখে।