রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এক টেলিভিশন ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে এক “বিশেষ সামরিক অভিযান” শুরু করার ঘোষণা দেন। এরপরই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ নগরীজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠলো।

দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হুঁশিয়ারি দিলেন, “কেউ যদি আমাদের ভূমি, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের জীবন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে- আমরা নিজেরাই তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।”

এটি ছিল এমন একটি মুহূর্ত, যা বহু মানুষের জীবন চিরদিনের জন্য পাল্টে দিয়েছিল।

  • স্বাধীনতার দিনেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে ইউক্রেনিয়ানদের

২৪ অগাস্ট ছিল ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস, একই সঙ্গে এই যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে তার কোন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

গত ছয় মাসে এই যুদ্ধে কোন পক্ষের কী ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে? যুদ্ধের গতি এখন কোন দিকে? এর পর কী ঘটতে পারে?

এরকম দশটি বিষয় নিয়ে নিচে আলোকপাত করা হলো:

১. রুশ হামলা শুরুর আগের ইউক্রেন

রুশ অভিযান শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনবাসের বিস্তীর্ণ এলাকা রুশ সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২১শে ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে, তিনি ইউক্রেনের দুটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল, স্বঘোষিত ‘দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক’এবং ‘লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক’কে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

ইউক্রেন, নেটো এবং পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করে।

তবে এই স্বীকৃতির পর প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার বাহিনীকে ইউক্রেনের দিকে পাঠানোর সুযোগ পান।

রাশিয়া এর আগেই ২০১৪ সালে ক্রাইমিয়াকে নিজের দেশের অংশ বলে ঘোষণা করেছিল।

কিন্তু বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এখনো এটিকে ইউক্রেনের অংশ বলে স্বীকার করে।

 

২. ছয় মাসের যুদ্ধের পর ইউক্রেনের এখনকার অবস্থা

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান শুরুর ছয় মাস পর রাশিয়া অনেকখানি সামনে অগ্রসর হয়েছে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে তারা অনেক জায়গা দখল করতে পেরেছে।

তবে কিয়েভের কাছে এবং উত্তরের আরও অনেক বড় শহরের কাছে যুদ্ধের শুরুতেই তারা যে বিরাট এলাকা দখল করেছিল, সেখান থেকে তাদের পিছু হটতে হয়েছে।

লুহানস্ক অঞ্চলের পুরোটাই এখন রুশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। দোনেৎস্ক অঞ্চলে তারা ধীরে ধীরে আরও এলাকা দখল করছে। খারকিভ শহর কয়েক মাস ধরে তীব্র গোলাবর্ষণের শিকার হয়েছে।

বেশ দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত এক লড়াই এবং অবরোধের পর গত মে মাসে মারিউপোলের আযভস্টাল ইস্পাত কারখানার বিশাল এলাকা থেকে যখন ইউক্রেনের সৈন্যদের সরিয়ে আনা হয়, তখন রাশিয়া ক্রাইমিয়ার সঙ্গে একটি স্থল-সংযোগ তৈরিতে সক্ষম হয়।

সেই সঙ্গে আযভ সাগরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে যায়। তারা ইউক্রেনের পুরো দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল দখল করে নেয়।

ক্রাইমিয়ার ওপর রাশিয়ার এখনো সামরিক নিয়ন্ত্রণ আছে, যদিও এই অঞ্চলটি গত অগাস্টে হামলার মুখে পড়ে।

সেবাস্টাপোলের বাইরে বেলবেক বিমান ঘাঁটিতে তখন হামলা হয়েছিল, যেটি ব্যবহার করে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে হামলা চালাতো।

দক্ষিণে খেরসন ছিল ইউক্রেনের প্রথম বড় শহর যেটি রুশ বাহিনী দখল করে নেয়।

কিন্তু ইউক্রেন এখন সেখানে হারানো ভূমি পুনর্দখলের চেষ্টা করছে নতুন পাওয়া দূরপাল্লার কামান ব্যবহার করে।

তারা নিপ্রো নদীর অপর পার থেকে দূরপাল্লার কামান ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে।

৩. যুদ্ধে কত মানুষ মারা গেছে

যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা

যে কোন যুদ্ধে কত মানুষ আসলে নিহত হয়েছে, তা নির্ণয় করা বেশ জটিল।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি অলাভজনক সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট এন্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (অ্যাক্লেড) সারা বিশ্বের রাজনৈতিক সংঘাতের তথ্য সংগ্রহ করে।

তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি নিউজের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের শুরু হতে ১০ অগাস্ট পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ইউক্রেনে নিহত হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিহতের এই অনুমান নির্ভর সংখ্যাটি আসলে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম।

ইউক্রেন এবং রাশিয়া উভয়পক্ষই দাবি করে, যুদ্ধে হাজার হাজার নিহত হয়েছে, কিন্তু তাদের এসব দাবি মেলানো কঠিন এবং স্বাধীনভাবে যাচাইও করা যাচ্ছে না।

জাতিসংঘ বলেছে, যুদ্ধে লিপ্ত উভয়পক্ষ যেসব সংখ্যা প্রকাশ করেছে সেগুলো তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

৪. যত মানুষকে পালাতে হয়েছে

বিভিন্ন দেশে শরণার্থীর সংখ্যা

জাতিসংঘ বলছে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর এ পর্যন্ত অন্তত এক কোটি বিশ লাখ মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে।

এর মধ্যে ৫০ লাখের বেশি মানুষ পাশের দেশগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ইউক্রেনের ভেতরেই বাস্তুচ্যূত হয়ে অন্য অঞ্চলে চলে গেছে।

তবে উদ্বাস্তু হওয়া হাজার হাজার মানুষ এর মধ্যে আবার তাদের বাড়িঘরে ফিরেছে, বিশেষ করে কিয়েভে।

অনুমান করা হয়, ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিলের ১৭ তারিখ পর্যন্ত ৬৪ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়।

এই হিসেব জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর থেকে পাওয়া।

কিছু ইউক্রেনিয়ান লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক থেকে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, তাদের বাহিনী মারিউপোল থেকে এক লাখ ৪০ হাজার বেসামরিক মানুষকে উদ্ধার করে। এদের কাউকেই রাশিয়ায় যেতে বাধ্য করা হয়নি।

তবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বলেছে, তারা রাশিয়া থেকে হাজার হাজার ইউক্রেনিয়ানকে চলে আসার জন্য সাহায্য করেছে।

বহু শরণার্থী ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ড এবং জার্মানিতে গেছে।

৫. যুদ্ধে এ পর্যন্ত যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে

ছয় মাসের যুদ্ধে ইউক্রেনে ভৌত অবকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা সহজেই চোখে পড়ে।

এক সময় যেখানে ছিল মানুষের ঘরবাড়ি এবং বড় বড় দালান-কোঠা, সেখানে এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ।

অনেক জায়গায় পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক ধসে গেছে।

যুদ্ধের সময় কেবল আবাসনের যে ক্ষতি হয়েছে, ১৮ জুন পর্যন্ত তার পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিক্স।

তারা হিসেব করে আরও বলছে, যুদ্ধের সময় অবকাঠামোর মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৪ বিলিয়ন ডলার।

তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

৬. বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইউক্রেনের উৎপাদিত গমের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাস হতে রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে।

তবে ছয় মাস পর এখন একটি সমঝোতা হয়েছে যার ফলে ইউক্রেন আবার খাদ্যশস্য রফতানি শুরু করতে পারবে।

এই সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, রাশিয়া বন্দর থেকে শস্যবাহী জাহাজ যাওয়ার সময় সেগুলো টার্গেট করবে না।

অন্যদিকে ইউক্রেন অঙ্গীকার করেছে, তাদের নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সাগরে যেখানে মাইন পোঁতা আছে, তার মধ্য দিয়ে শস্যবাহী জাহাজকে নিরাপদে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।

ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরের বন্দরগুলো থেকে কিছু জাহাজ খাদ্যশস্য নিয়ে ছেড়ে গেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এরকম একটা পরিস্থিতিতে আসলে ইন্স্যুরেন্স করানো কঠিন, তাই হয়তো খাদ্যশস্য পরিবহনের জন্য অনেক জাহাজ ফিরে আসবে না।

জাতিসংঘ এবং তুরস্ক এই সমঝোতায় পৌঁছাতে মধ্যস্থতা করেছিল। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত যে গুটিকয় কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, এটি তার একটি।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস নিজে ব্যক্তিগতভাবে এই মধ্যস্থতায় জড়িত ছিলেন। তিনি এই সমঝোতা যেন টিকে থাকে সেজন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ‘বিশ্বাস রেখে’ কাজ করে যেতে।

অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েব এরদোয়ান বলেছেন, শস্য নিয়ে এই চুক্তির উপর ভিত্তি করে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা চলতে পারে। তবে এরকম উৎসাহ কমই আছে।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের যেসব এলাকায় অভিযান চালিয়েছে, সেখান থেকে চলে যাওয়ার পরই কেবল আলোচনা হতে পারে।

৭. রাশিয়ার দ্রুত বিজয়ের লক্ষ্য কেন অর্জিত হয়নি

এই যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন দুপক্ষের সামরিক শক্তির বিরাট ফারাক দেখে অনেকই ধারণা করেছিলেন, রাশিয়া বেশ দ্রুত বিজয় পাবে।

রাশিয়ার মত এক বিরাট সামরিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে ইউক্রেন কোন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারবে না, এটাই মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু ইউক্রেন শুরুতেই যে প্রতিরোধ গড়েছিল, তাতে অনেক সামরিক বিশ্লেষক পর্যন্ত অবাক হয়েছেন।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমর বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, “বাইরে থেকে যারা এই যুদ্ধের ওপর নজর রাখছিলেন, তাদের প্রায় সবারই ধারণা ছিল যে, রাশিয়া খুব দ্রুত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করে নেবে, সরকারের পতন ঘটবে এবং লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। কিন্তু নেটো জোট যে এরকম বিপুল সামরিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সাহায্য ইউক্রেনকে দেবে, এটা অনেকে চিন্তা করেনি।”

তিনি বলেন, “দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনের সেনাদল নিজেদের দেশ প্রতিরক্ষায় যে এভাবে নিয়োজিত হবে, সেটাও অনেকে আশা করেনি। যখন রুশ বাহিনী কিয়েভ দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন নেটো জোট এবং ইউক্রেনকে সমর্থনকারী অন্যান্য দেশ তাদের সাহায্যের পরিমাণ অনেক বেশি বাড়িয়ে দিল। ফলে যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক শক্তির যে বড় ফারাক ছিল, তা এখন আপাত দৃষ্টিতে প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

৮. এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা কি আরও বেড়েছে?

এই যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া যে গতিতে বিভিন্ন এলাকা দখল করছিল, তার গতি অনেক ধীর হয়ে এসেছে, এবং অনেক এলাকা থেকে তাদের পিছু হটতে হয়েছে।

যুদ্ধ বেশ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, এমন আশঙ্কা বাড়ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্টভাষাতেই বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ইউক্রেনের যেসব এলাকা দখল করেছে, সেগুলো রাশিয়া ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তারা কোন শান্তি আলোচনায় যাবেন না।

 

ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা গত ছয় মাসে যেভাবে বেড়েছে তাতে সহজে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটবে, এমন আশা করা কঠিন।

“ইউক্রেন এখন নেটো জোট এবং পাশ্চাত্যের কাছ থেকে বিপুল সামরিক সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছে। এর ফলে তারা যুদ্ধে কিছুটা সাফল্য পাচ্ছে, যদিও রাশিয়ার দখলে যাওয়া ভূমি পুনর্দখলে সেরকম সফল হয়নি। যেমন তারা রুশ নিয়ন্ত্রিত ডনবাসে এবং ক্রাইমিয়াতে রাশিয়ার সামরিক স্থাপনায় অনেক সফল সামরিক হামলা চালিয়েছে। গত দুমাস ধরে আমরা এটা দেখছি । তার চেয়ে বড় কথা, খোদ রাশিয়ার ভেতরেও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এমনকি মস্কোতে তারা প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ এক উপদেষ্টার মেয়েকে পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করেছে বলে বলছে রাশিয়া”।

“কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইউক্রেনের হাত অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তারা কেবল নিজের দেশেই প্রতিরোধ গড়ছে না, তারা রাশিয়ার ভেতরে গিয়েও হামলা চালাচ্ছে। কাজেই এই যুদ্ধ অত সহসা শেষ হবে বলে আমি মনে করি না।”

৯. পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কতটা

যুদ্ধের শুরু থেকেই পরমাণু দুর্ঘটনা বা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে বার বার আলোচনায় এসেছে।

গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনা আছে এরকম শহরের আশেপাশে পর্যন্ত যেভাবে লড়াই চলেছে, তাতে যে কোন সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন হুমকি দিয়েছেন যে, নেটো জোট যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তিনি স্বল্পপাল্লার কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন।

মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, “প্রেসিডেন্ট পুতিন যে হুমকি দিয়েছেন, এটা হতে পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু হবে না, এটা জোর গলায় বলা যায় না। যদি প্রেসিডেন্ট পুতিন সত্যই এরকম অস্ত্র ব্যবহার করেন, বা ইউক্রেনের কোন পরমাণু বিজলি উৎপাদন স্থাপনা যদি কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তো শুধু ইউক্রেন নয়, পুরো ইউরোপেই প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়বে”।

“ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এখন সারা পৃথিবীতেই অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হোক, সেটা কেউই চাইবেন না। সবাই চাইবেন এরকম ঘটনা যেন না ঘটে।”

১০. পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা- কে বেশি সংকটে

যুদ্ধ শুরুর পরপরই পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে। রাশিয়াও কিছু পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। সব মিলিয়ে এসবের একটা বিরাট অভিঘাত পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে।

কিন্তু এতে রাশিয়ার আসলে কতটা ক্ষতি হয়েছে? আর রাশিয়ার নেয়া পাল্টা ব্যবস্থায় ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলো কতটা সংকটে?

ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, “রাশিয়ার যে একটা অর্থনৈতিক সংকট হয়েছে, বা এই সংকট যে আরও গভীর হতে যাচ্ছে তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। রাশিয়া রফতানি করে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, খাদ্যশস্য। আর তাদের আমদানি করতে হয় অনেক কিছু। এগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র এশিয়া এবং আফ্রিকার কিছু দেশের সঙ্গে তাদের কারিগরি এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক কোন না কোনভাবে রয়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে তারা যে প্রযুক্তিগত সামগ্রী পেত, সেগুলো আর আসছে না। আমি বলবো তাদের সংকট আরও ঘনীভূত হবে।”

কিন্তু ইউরোপের সংকটও কম নয়। রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে তৈরি হয়েছে এই সংকট। একইসঙ্গে রাশিয়াও ইউরোপে গ্যাসের সরবরাহ ইচ্ছেকৃতভাবে কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করছে এসব দেশ।

ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, “আসন্ন শীত মৌসুমে ইউরোপে যে জ্বালানি সংকট দেখা দেবে, চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে যে একটা ব্যবধান দেখা দেবে, পুরো ইউরোপজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে, সেটা থেকে যে কীভাবে তারা উদ্ধার পাবে বলা কঠিন। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, আগামী এপ্রিল-মে’র আগে বলা যাবে না। এ থেকে নিস্তার পাওয়া তাদের জন্য বেশ কঠিন হবে।”