ঢাবি হলজীবন কেমন কাটছে শিক্ষার্থীদের . . .

ঢাবি হলজীবন কেমন কাটছে শিক্ষার্থীদের . . .

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলজীবন উপভোগ করেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে সাধের এই হলগুলোর খাবারের মান ঠেকেছে তলানিতে। সম্প্রতি দাম ৪০-৫০ শতাংশ বেড়ে গেলেও মান আরও কমেছে। ফলে পুষ্টিহীন বিস্বাদ খাবারই শিক্ষার্থীদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের খাবার থেকে যে পুষ্টিমান পান, তা তাঁদের প্রয়োজনের অর্ধেকের কাছাকাছি। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ফ্রি খাওয়া ও চাঁদাবাজির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন।

আগে হলের ক্যান্টিনে ৩০-৪০ টাকার মধ্যে খাওয়া সম্ভব হলেও গত কয়েক মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫-৬০ টাকায়। এতে আর্থিকভাবে চাপে পড়েছেন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। বিপরীতে ঢাবির পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যান্টিনে এখনও ৩৫ টাকায় মানসম্মত খাবার পাওয়া যায়।

ঢাবির হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী রিপন আহমেদ ক্যান্টিনে খাবার নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, চালের মান খুবই খারাপ। ভাত থেকে গন্ধ আসে। ভাতের মধ্যে ময়লা থাকে; মাছি ও পোকা ওড়ে। খাবারে কোনো স্বাদ নেই। খেতে বসলে রুচি আর থাকে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ক্যান্টিন মালিকদের অল্প লাভে শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের মধ্যে মানসম্মত খাবার সরবরাহ করার কথা। তবে ছাত্রনেতা এবং তাঁদের অনুগত ছেলেমেয়েরা প্রভাব খাটিয়ে বিনা পয়সায় খাবার খেয়ে যান। এর প্রভাব সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে। দাম বেড়ে যায়, মান কমে যায়। তিনি বলেন, দুনিয়ার সব দেশে ছাত্রছাত্রীর জন্য হল আছে। এ ধরনের অরাজকতা কম দেশেই আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, হলের খাবারের পুষ্টিমানের অবস্থা খুবই খারাপ। এর কারণ হলো, ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের নেতারা চাঁদাবাজি করে। এই লোকসান এড়াতে ক্যান্টিন মালিকরা নিম্নমানের খাবার দেয়।

তবে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে হলগুলোতে ভর্তুকি দিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যথা- চাল, ডাল, তেল রেশনিংয়ের আওতায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নিয়ে আসা যায়। এতে শিক্ষার্থীদের সুবিধা হবে। অনেক সরকারি সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রেশনের সুযোগ-সুবিধা পায়। এ ধরনের সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ঢাবির হলগুলোতে দুই ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। মেস বা ডাইনিং হল এবং ক্যান্টিন। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্যান্টিনে খাবার খান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যান্টিন ও মেসকে বিনা পয়সায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি দেয় এবং নামমাত্র ভাড়া নিয়ে থাকে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, হলের খাবারের পুষ্টিমান নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা এ খাদ্য খেয়ে দৈনিক ১ হাজার ৮২১ কিলোক্যালরি পান। অথচ পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর দিনে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার কিলোক্যালরি গ্রহণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হলে থেকে যে খাবার গ্রহণ করেন, তার পুষ্টিমান চরম দারিদ্র্যসীমারও নিচে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ক্যান্টিন পরিচালক বলেন, ‘প্রতিদিন ৬-৭ হাজার টাকা বাকি পড়ে। বলে- ভাই, মানিব্যাগ আনিনি; পরে দেব। আর দেয় না। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা টাকা না দিয়ে চলে যায়। এভাবে প্রতি বেলা ২০-৩০ জন ফ্রি খেয়ে যায়। বিভিন্ন উপলক্ষে বিরাট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়।’ আরেকজন অভিযোগ করেন, নেতাদের রুমে রুমে খাবার পাঠাতে দুইজন লোক লাগে। প্লেট-জগ ঠিকমতো ফেরত পাওয়া যায় না।

খাবারের মান নিয়ে এ সংকট বহুদিনের। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং হলগুলোতে দেড়-দুই টাকায় ভালো খাবার খেয়েছেন বলে জানান তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাহলুল মজনুন চুন্নু। তখন হলের ক্যান্টিনগুলোকে ডাইনিং হল বলা হতো। তিনি বলেন, প্রতিটি হলে রেশন দেওয়া হতো। ক্যাটারারকে (বর্তমানে ক্যান্টিন পরিচালক) নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকত, প্রতি বেলায় কী খাবার এবং কতটুকু দিতে হবে। দেখা যেত, ১২০ টাকায় পুরো মাস ভালোভাবে চলে যেত।

তিনি বলেন, তখনও ফাও খাওয়ার লোক ছিল এবং ক্যাটারার খাবারের মানে গণ্ডগোল করত। এটা ঠেকাতে ছাত্রনেতারা একসময় সব রাজনৈতিক দল থেকে হলে হলে ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক নেন। তারা খাবার চলাকালে দাঁড়িয়ে থাকত, যাতে কেউ ফ্রি খেতে না পারে। প্রশাসনও দেখভাল করত। এখন তো প্রভোস্টরা শুধু হলে এসে রুটিন ওয়ার্ক করেন। তিনি বলেন, প্রশাসন চাইলে এখনও এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।

এদিকে হলের খাবারের নিম্নমানের কারণে শিক্ষার্থীদের অনেকে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী আনন্দবাজারের ক্যাফে আল মাসুদ, নীলক্ষেতের মামা হোটেল, শাহবাগের জামালপুর হোটেলে খান। এসব হোটেলের মালিকরা সমকালকে জানিয়েছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে খাবার পরিমাণে একটু হ্রাস করলেও তাঁরা দাম বাড়াননি।

ক্যাফে আল মাসুদের জুলহাস বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি-দোকান ভাড়া মিলিয়ে তাঁর মাসে ব্যয় আড়াই লাখ টাকার বেশি। এ ব্যয় বাদ দিলে খাবারের দাম ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

সমাধান কোন পথে: অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, হল প্রশাসন, ক্যান্টিন মালিক এবং ছাত্রনেতাদের চতুর্মুখী সমন্বয় প্রয়োজন। বিনা পয়সায় খাওয়ার অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ক্যান্টিন মালিকরা ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ করবে, নইলে তাদের অনুমোদন বাতিল করতে হবে। মান বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সরকারের খাদ্য সংস্থা থেকে সাহায্য নেওয়া সম্ভব। তাঁর ধারণা, সরকার এটিকে ইতিবাচকভাবেই নেবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শিক্ষার্থীদের পুষ্টিমানের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলাদা অর্থ বরাদ্দ করা উচিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বেড়ে উঠতে দেওয়ার জন্যই এটা করা উচিত।

বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির বলেন, তাঁরা বর্তমান বাজারমূল্য এবং হলের খাবার মূল্যে সমতা আনার জন্য চেষ্টা করছেন। উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। শিগগিরই সব হলে দাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের কোনো অসুবিধা না হয়।

ভিন্ন চিত্র পার্শ্ববর্তী বুয়েটে: বর্তমানে বুয়েটে খাবারের মান সন্তোষজনক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এখানকার শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন হলের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা বলেন, খাবার নিয়ে তাঁদের কোনো অভিযোগ নেই। তাঁরা বলেছেন, ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যার পর থেকে বুয়েটের ক্যান্টিনের খাবারসহ সব ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন এসেছে। স্বচ্ছতা এসেছে সব ক্ষেত্রে। ফলে বেড়েছে খাবারের মান।

জানতে চাইলে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ থাকায় ফ্রি খাওয়ার সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে খাবারের মান বেড়েছে।