একটি স্নিগ্ধ পাঠশালার গল্প

 একটি স্নিগ্ধ পাঠশালার গল্প

দুধকুমার, গঙ্গাধর আর ব্রহ্মপুত্র নদের সংযোগ রেখায় জেগে ওঠে এক খণ্ড ভূমি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সেই ধু ধু ভূমিতে একে একে ঘর বাঁধে ষোলোটি পরিবার। সহায় সম্বলহীন সেই পরিবারগুলির প্রতিদিনের জীবন-যাপনে সব সময় পাশে ছিল দৈনিক সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’। বন্যায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, চরবাসীকে ঘর বাঁধতে সহযোগিতা, ঈদ পালা-পার্বণে পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে উত্তরের হাঁড় কাপানো শীতে গরম কাপড়ের সংস্থান সবকিছুতেই কাছে ছিল ‘প্রথম আলো’। ২০০৫ সালে চরবাসী ভালোবেসে ভূখণ্ডের নাম রাখে “প্রথম আলো চর’’। ইতিমধ্যে ধু ধু চরে পলি পড়ে জমি হয়েছে উর্বরা। প্রথম আলো চরে পরিবারের সঙ্গে বাড়তে বাড়তে সংখ্যাটি চার শ ছাড়িয়েছে।

স্থানীয় পরিবারগুলোর দাবিরমুখে, প্রথম আলো ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ও সামিট গ্রুপের সহযোগিতায় ২০০৯ সালে চরে যাত্রা শুরু করে ‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’। সময়ের পরিক্রমায় পাঠশালাটির একটি নিজস্ব পরিচিতি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই পাঠশালা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। পাঠশালা পরিদর্শনে এসে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মরক্ষার সৌজন্যের দেখা মেলে। কিন্তু প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালার ক্ষেত্রে তা ছিল ব্যতিক্রম। পাঠশালার শিক্ষার্থীরা রঙিন কাগজ ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক উৎসাহ দিলেন প্রতিটি ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতে। কথোপকথনে জানা গেল, শিক্ষার্থীরা পাঠশালকে ভালোবাসে, ভালোবাসে প্রথম আলো চরকে।

বিদ্যালয়টির বিশিষ্ট রূপ ও নিজস্ব চরিত্র সহজেই যে কারও নজর কাড়বে। কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে। রাস্তাও ভালো। একেবারে শেষে দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ব্রহ্মপুত্র নদীর কাছে যাওয়ার জন্য ঢালু পথ বেয়ে খানিকটা হেঁটে যেতে হয়। ঘাটে অপেক্ষা করছে একটা লম্বা কাঠের নৌকা। তাতে করে যেতে হবে অন্য ঘাটে। চরবাসী সেই নৌকায় উঠে পড়ে ব্যাগ, বস্তা, বাক্স নিয়ে। গরু, ছাগল, সাইকেল, মোটরসাইকেলও পার হয় নৌকায়। পাঠশালার শিক্ষকরাও নৌকায় করে স্কুলে যাতায়াত করে।

ও পারে পৌঁছে, ঘোড়ার গাড়িতে করে মিনিট বিশ পথ পেরোলে এসে পড়ে পাঠশালা অঙ্গন। পাঠশালাটি মাঝারি আকারের, লাল আর সবুজে পরিপাটি রং করা। বোঝা যায় পাঠশালাটি তৈরি হয়েছে পরম মমতায়। আর এর রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে, যত্নে, ভালোবাসায়। স্কুলের চারপাশ ঘিরে নানা জাতের গাছের সারি। গেট থেকে স্কুলঘর পর্যন্ত সবুজ ঘাসে ঢাকা ছোট মাঠ পেরোতে হয়। পাঠশালার বারান্দা ঘিরে ফুলগাছ আর ঝোপ। ছায়া সুনিবিড় শান্ত পরিবেশ।

স্কুলটার এমন অপরূপ চেহারার নেপথ্যে রয়েছেন প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালার উপদেষ্টা সফি খান। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় প্রথম আলো পত্রিকার কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের সময় সফি খান প্রথম এই নামহীন ভূ-খণ্ডের মানুষের দুর্দশার কথা পত্রিকায় তুলে ধরেন। এরপর নিয়মিত চরের মানুষের সঙ্গে যোগযোগ রেখেছেন। বিপদে-আপদে উত্তাল নদী পেরিয়ে সব সময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মূলত সফি খানের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, প্রথম আলো ট্রাস্ট ও সামিট গ্রুপের সার্বিক সহযোগিতায় স্কুলটি বর্তমানে অবস্থায় এসেছে। পাঠশালাটিতে বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ২০২৩ সালে পাঠশালাটিতে ৮৯ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

Eadmin

Related post